দূরে আলোর একটা নিশানা দেখা যায়। আলোটা সম্মুখে আসছে ধীরে। আমি আর জাহিদ ভাই নড়ে-চড়ে বসলাম। যাক এতক্ষণে এল তাহলে। ঘণ্টাখানেক হয় অপেক্ষায় বসে আছি। আমরা ডাকবাংলো থেকে যখন বের হয়েছি, তখন রাত ভোর। চারদিকে সুনসান নীরবতা। হঠাত্ একটা কুকুর ঘেউ করে ওঠে। যেন বলতে চায়, আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে কোত্থেকে এলি বাপ? আমি আর শিল্পী জাহিদ হোসেন ছটপূজারীদের পাকড়াও করতে বসে আছি, জামালপুর শহরের উপকণ্ঠে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। গতকাল বিকালে হয়েছে ছট বা সূর্যের বিদায় এখন হবে নতুন ছট বা সূর্যের আবাহন। আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ করে এই তো পূজারীর দল আসছে।
আলোটা আরো কাছে এগিয়ে আসছে। কয়েকটা ভ্যানে করে পূর্ণকরা কুলা, ডালা, খাঁচির ওপর রাখা আছে মাটির পিদিম। দূর থেকে পিদিমের আলোই চোখে পড়ছিল। এরপর এক-এক করে সিএনজি, গাড়ি, রিকশায় করে আসছে পূজারীরা। শহরের পাশের সড়ক থেকে তারা একে একে নেমে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। আমরা তখনো সড়কে দাঁড়িয়ে, যতদূর চোখ যায়, অন্ধকারে মাটির পিদিমের আলোর বিশাল সারি। আমরাও তাদের পিছু নিলাম।
নদীর পাড়ে খাঁচি, ডালা-কুলা নামিয়ে এই অন্ধকারে শুরু হলো তাদের সূর্যবন্দনার প্রস্তুতি। নদীর পাড় ঘেঁষে আখ বা গেন্ডারি পুঁতে যার যার জায়গা নিশ্চিত করা হলো। তার পাশে রাখা হলো নিজের সঙ্গে করে আনা খাঁচি, ডালা-কুলা। ঠিক আখের পাশ ঘেঁষে রাখা হলো মাটির ঘট। ঘটের মুখে উল্টা করে রেখে দেয়া হলো পঞ্চ আম্রপত্র। তার ওপরে সরা রেখে সরার ওপর চাল, চালের ওপর মাটির পিদিম রাখা হলে সম্পন্ন হলো প্রস্তুতি।
অন্যদিকে খাঁচিতে করে আনা নানা জাতের ফল ও পিঠা সাজিয়ে রাখা হয়। আর আশপাশে রাখা হয় বিসর্জনের প্রাণী। বিসর্জনের প্রাণীর মধ্যে আছে ছাগল, মুরগি ও কবুতর। পূজার পিঠাতে আছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পিঠা বানানোর ছাঁচগুলো হয় কাঠের। এক-একটা ছাঁচ-এর বয়স কয়েক প্রজন্ম। তার মা তাকে দিয়ে গেছেন, তার মাকে দিয়ে গিয়েছিলেন আবার তার মা।
কাঠের ছাঁচগুলো এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাত ধরে বেঁচে আছে। এগুলো বিক্রিযোগ্য নয়, দানযোগ্য নয়। জামালপুরের শহর পরিচ্ছন্নকর্মীদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন কেরালা থেকে। মূলত ব্রিটিশ আমলে তাদের নিয়ে আসা হয় শহর পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য। তবে শ্রী বাদল রায় রাও বললেন অন্য কথা। তাদের পূর্বপুরুষরা যদিও এখানে ছিলেন, তাদের যাওয়া-আসা ছিল। তাঁর বাবা এসেছেন অনেক পরে। তাঁর বাবা রাগ করে কেরালা থেকে চলে এসেছিলেন। তাঁদের এখনো যাওয়া-আসা আছে।
আসি বক্ষপুত্র পাড়ে।
চলছে পুরোদমে পূজার প্রস্তুতি। সূর্যদেবের আগমন সন্নিকটে। ক্ষণে ক্ষণে বেজে উঠছে শাঁখ। পিদিম আরো জ্বালানো হয়েছে, আগুনে ধুপ নিক্ষেপ চলছে। পূজা করতে আসা প্রত্যেকের জন্য একটি করে কুলা সাজানো—যেখানে আছে নানা রকমের পিঠা ও ফল, আছে ফুল। একসময় সকল নারী মিলে মাথায় লম্বা সিঁদুর কেটে, হলুদ কাপড় পরে লম্বা ঘোমটা টেনে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁরা হাত জোর করে প্রার্থনায় রত সূর্যদেবের কাছে। সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত এভাবেই দাঁড়িয়ে। আর ক্ষণে ক্ষণে চলছে উলুধ্বনি আর শাঁখের বাদ্য। সূর্য উদয় সম্পন্ন হলে শুরু হয় আত্মা বিসর্জন। যার যার সঙ্গে করে নিয়ে আসা প্রাণী সূর্যদেবের উদ্দেশে উত্সর্গকরণ। এর মধ্যে আছে নীলাম্বরের ছেলের জন্য আনা ছাগল। ছাগলের গলায় জবা ফুলের মালা পরিয়ে মন্ত্র পড়ে ছুড়ে দেয়া হলো ছাগলটাকে নদীর মাঝে। সঙ্গে থাকা ছেলে-ছোকরারা সেই ছাগল আয়ত্ত করার জন্য সে কী হুড়োহুড়ি। একই সময়ে দুজন দুই পায়ে ধরেছে। তাই অবশেষে কাড়াকাড়ি শেষ হয় ভাগ করে নেয়ার সমঝোতায়। এভাবে একে একে সঙ্গে করে নিয়ে আসা মোরগ, কবুতরগুলো নদীতে ছুড়ে ফেলা হয়। আর অন্যরা লুফে নেয়। তারপর সাজানো কুলাগুলো নদীর পানিতে চুবিয়ে কিছু পিঠা ও কিছু ফল সূর্যদেবের জন্য বিসর্জন দিয়ে বাকিগুলো নিজেদের জন্য রেখে দেয়া হয়। পূর্ণাঙ্গরূপে সূর্য উদয় হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় সূর্য পূজার। সকলে গোসল করে পবিত্র হয়ে ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় পরে বাড়ি ফিরে যান। বাড়িতে গিয়ে এ ওর বাড়ি দিনভর চলে খাওয়াদাওয়া।
কালীপূজার ছয়দিন পরে হয় সূর্যপূজা। পূজার আগের দুই দিন সকলে উপোস করেন। এই পূজায় সাধারণত মেয়েরা অংশগ্রহণ করেন। পারতপক্ষে ছেলেরা থাকেন না। মহিলাদের খাঁচি অথবা অন্য দ্রব্য বহনের জন্য দু-একজন পুরুষ মানুষ সঙ্গে থাকেন। এই নৈবেদ্য সূর্যদেব গ্রহণ করেন এবং তার স্ত্রী উষা দেবীকেও উদ্দেশ করা হয়।
ছটপূজার প্রচলন বিহার থেকে এসেছে। ভারতের বিহার ও ঝাড়খণ্ডে যেখানে বিহারি বংশোদ্ভূতদের বাস সেখানে বিশাল ধুমধাম করে ছটপূজা করা হয়। উত্তর প্রদেশেও ছটপূজার প্রচলন আছে। ছটপূজা প্রচলনের হেতু খুঁজতে গেলে যা পাওয়া যায়—
মহাভারতের যুগে ‘অঙ্গদেশ’ বলে পরিচিত ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশ। অঙ্গদেশ ছিল কৌরবদের বা হস্তীনাপুর রাজবংশের অধীন। পাণ্ডব ও কৌরবদের শাস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছিল। হঠাত্ সেখানে আমন্ত্রণ ছাড়াই হাজির হন সূর্যপুত্র কর্ণ। হাজির হয়ে অর্জুনকে চ্যালেঞ্জ ছোড়েন। কর্ণ রাজপুরুষ ছিলেন না বলে তাঁকে প্রবল অপমান করেন ভীম। তবে রাজপুরুষ দুর্যোধন কর্ণের তেজ ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা দেখে দলে টানার ফন্দি আটেন। দুর্যোধন কর্ণকে অঙ্গদেশ দান করেন এবং রাজা বলে ঘোষণা করেন। কেউ না জানলেও কর্ণ আসলে সূর্যের ঔরসজাত কুন্তীর কুমারী অবস্থায় জাত পুত্র। কুন্তী কর্ণকে চিনেও পরিচয় দেননি। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে, পাণ্ডবদের বাঁচাতে যখন নিজে কর্ণের কাছে প্রস্তাব রাখেন পাণ্ডবপক্ষে চলে আসার জন্য, তখন সকলে জেনেছিল কর্ণ আসলে কুন্তীপুত্র।
কর্ণ কিন্তু প্রথম থেকেই সূর্যের উপাসক ছিলেন। প্রচলিত আছে, অঙ্গদেশের রাজা হওয়ার পরে সেই অঞ্চলে ধুমধাম করে সূর্যদেবের পুজো ও উত্সবের প্রচলন করেন কর্ণ এবং সেই উত্সবই কয়েক হাজার বছর পেরিয়ে টিকে রয়েছে ছটপূজা হিসেবে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কর্ণ’র মৃত্যু হয়। তবে রাজা হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়—যার কারণে তাঁর মৃত্যুর পরেও অঙ্গদেশের মানুষ ভক্তিভরে সূর্যষষ্ঠী ও ছটপুজো পালন করে এসেছে। যা সঞ্চারিত হয়েছে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এবং বাংলাদেশেও।
তবে ছটপূজা প্রচলন নিয়ে আরো কিছু কাহিনিও প্রচলিত আছে। অনেকে বলেন, রাম-সীতা ১৪ বছর বনবাস কাটিয়ে অযোধ্যায় ফেরার পরে এই পুজো করেছিলেন। আবার আর একটি গল্প রয়েছে রাজা প্রিয়ব্রতকে নিয়ে। অনেক যজ্ঞ করার পরে তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রানি মৃতপুত্র প্রসব করেন। শোকে-দুঃখে রাজা আত্মহত্যা করতে গেলে, তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান দেবী খষ্ঠী এবং তিনি বলেন যদি কেউ শুদ্ধচিত্তে তাঁর পূজা করে তবে তার সন্তানলাভ হবে। রাজা প্রিয়ব্রত দেবী খষ্ঠীর আদেশ পালন করেন এবং সন্তান লাভ করেন। সেই থেকে ঘরে ঘরে ছটপুজোর প্রচলন হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছটপূজা হয়। বিশেষ করে প্রাচীনকালে ভারতের বিহার, ঝাড়খণ্ড ও কেরালা থেকে আসা হিন্দুরা ছটপূজা করে থাকে। কাজেই বাংলাদেশের প্রতিটি শহরেই ছোট-বড় ছটপূজা হয়।