নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে সস্ত্রীক মারধর করেছে সংসদ সদস্য হাজি মোহাম্মদ সেলিমের (হাজি সেলিম) ছেলে ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় হাজি সেলিমের দ্বিতীয় ছেলে মোহাম্মদ ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পৃথক অভিযোগে এক বছর করে জেল দিয়েছে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর আগে রাজধানীর চকবাজারের দেবিদাস ঘাট লেনে হাজি সেলিমের বাসায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সাড়ে ছয় ঘণ্টা র্যাব ২৬, দেবিদাস ঘাট লেনের ‘চাঁন সরদার-দাদা বাড়ি’তে অভিযান পরিচালনা করে। গত রবিবার রাতে ধানমন্ডির কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে নৌবাহিনীর লেফট্যানেন্ট ওয়াসিফ ও তার স্ত্রীকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার সকালে ঐ কর্মকর্তা বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।
হাজি সেলিমের নয় তলাবিশিষ্ট ৯ বাড়ি থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি এয়ারগান, পাঁচ লিটার বিদেশি মদ, ১০ ক্যান বিয়ার, তিনটি ভিপিএস (ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার) যন্ত্র, ওয়াকিটকির বেজ স্টেশন ও ৩৮টি ওয়াকিটকি, দুটি হ্যান্ডকাফ ও দেহরক্ষী জাহিদুলের কাছ থেকে ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ঐ বাড়িতে একটি টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছে র্যাব। এই টর্চার সেলে এলাকার লোকজনকে আটক করে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। অননুমোদিত ফ্রিকোয়েন্স দিয়ে ওয়াকিটকি ব্যবহারের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত মোহাম্মদ ইরফান সেলিম ও জাহিদুলকে ছয় মাসের জেল দেয়। এছাড়া অনুমোদন ছাড়াই মদ পানের অভিযোগে তাদের আরো ছয় মাসের জেল দেয়।
মোহাম্মদ ইরফান সেলিম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তিনি নোয়াখালীর সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর জামাতা। হাজি সেলিমের বাসা থেকে একটু দূরেই ২৫, দেবিদাস ঘাট লেনের ইরফানের মালিকানাধীন নয় তলা একটি বাড়ির নিচতলায় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়।
গতকাল সন্ধ্যায় র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শেষে হাজি মোহাম্মদ সেলিমের ওই বাড়ির নিচতলায় র্যাব প্রেস ব্রিফিং করে। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাবের গোয়েন্দা শাখা, র্যাব-১০ ও র্যাব-৩ এর সমন্বয়ে একটি টিম সোমবার দুপুরে বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু অবৈধ জিনিসপত্র উদ্ধার করে। এদের মধ্যে ওয়াকিটকি ও ওয়াকিটকি বেজ স্টেশন ব্যবহার করে ইরফান সেলিম চাঁদাবাজি ও নিজ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এ ঘটনায় ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী জাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইরফান সেলিম ও জাহিদুলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হবে।
বাড়িটি ছিল টর্চার সেল
চাঁদাবাজি ও দখলদারির কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ধরে এনে হাজি সেলিমের বাড়িতে এই টর্চার সেলে বন্দি করে রাখা হতো। ভবনের তিন তলায় রয়েছে আধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিসহ অত্যাধুনিক কন্ট্রোল রুম, ড্রোনসহ বিভিন্ন ডিভাইস। রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (ভিভিআইপি) নিরাপত্তায় নিয়োজিত এলিট বাহিনীর কাছে যেসব সরঞ্জাম থাকে, সেরকম সরঞ্জাম পাওয়া গেছে এখানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় এই কন্ট্রোল রুম ব্যবহার করা হতো বলে র্যাবের ধারণা। এছাড়া এলাকার মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করতেও এই টর্চার সেলে ব্যবহার করা হতো বলে র্যাব জানিয়েছে।
‘কন্ট্রোল রুমের’ বিষয়ে র্যাবের কর্মকর্তারা বলেন, হাজি সেলিমের ভবনের তিন ও চার তলা থেকে এসব সরঞ্জামসহ তারা অবৈধ একটি বিদেশি পিস্তল ও একনলা বন্দুক জব্দ করেছেন। ওয়াকিটকির প্রতিটি চার কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা কাভার করত। এ ধরনের ওয়াকিটকি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করা নিষেধ। তবে হাজি সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম এ ব্যাপারে কোনো অনুমোদন নেননি। কর্মকর্তারা জানান, ঐ বাসায় একটি ড্রোন, রাউটার, একটি ভর্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার বা ভিপিএস পাওয়া গেছে। এই ভিপিএস দিয়ে মূলত তার পুরো নেটওয়ার্কে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করত, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ট্র্যাক করতে না পারে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। নীলক্ষেত থেকে বই কিনে মোটরসাইকেলে করে লেফট্যানেন্ট ওয়াসিফ আহমদ মোহাম্মদপুরে তার বাসায় ফিরছিলেন। সঙ্গে তার স্ত্রীও ছিলেন। ধানমন্ডির ল্যাব এইড হাসপাতালের সামনের সিগন্যাল ক্রসিংয়ে জ্যাম ছিল। এ সময় তার মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে একটি বুলেট প্রুফ জিপ গাড়ি ধাক্কা দেয়। ওয়াসিফ আহমদ মোটরসাইকেল থামিয়ে গাড়িটির গ্লাসে নক করে নিজের পরিচয় দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার কারণ জানতে চান। তখন এক ব্যক্তি বের হয়ে তাকে গালিগালাজ করে। তারা গাড়ি নিয়ে কলাবাগানের দিকে যায়। মোটরসাইকেল নিয়ে ওয়াসিফ আহমদও তাদের পেছনে পেছনে যান। কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে গাড়িটি থামলে ওয়াসিফ তার মোটরসাইকেল নিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ান। তখন তিন-চার জন লোক গাড়ি থেকে নেমে বলতে থাকে, ‘তোর নৌবাহিনী/সেনাবাহিনী বাইর করতেছি, তোর লেফটেন্যান্ট/ক্যাপ্টেন বাইর করতেছি। তোকে আজ মেরেই ফেলব’ এই কথা বলে তাকে কিলঘুষি দিতে থাকে। ওয়াসিফের একটি দাঁত ভেঙে গিয়ে তার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে যায়। তখন ওয়াসিফের স্ত্রী এগিয়ে এলে, ইরফান তাকেও মারধর করেন। এক পর্যায়ে ওয়াসিফ চিত্কার করে বাঁচার আকুতি জানান। মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ ইরফানের কাছে বিষয়টি জানতে চায়। পথচারীরা ওয়াসিফ আহমদকে ফুটপাতে ফেলে এলোপাতাড়ি মারধর করার দৃশ্য ভিডিও করেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে খবর পেয়ে ধানমন্ডি থানার এসআই আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ দুই পক্ষকে শান্ত করে। ইরফান গাড়িচালক মিজানকে রেখে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে অপর একটি গাড়িতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
রাত ৯টার দিকে পুলিশ আহত লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। প্রাথমিক চিকিত্সা শেষে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায়। রাত ১১টার দিকে লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় জিডি করেন। পুলিশ গাড়িচালক মিজানকে গ্রেফতার দেখায়।
গতকাল ওয়াসিফের করা মামলার আসামিরা হলেন: মোহাম্মদ ইরফান সেলিম, তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, হাজি সেলিমের মদিনা গ্রুপের প্রটোকল অফিসার এ বি সিদ্দিক দিপু এবং গাড়িচালক মিজানুর রহমানসহ অজ্ঞাত আরো দুই-তিন জন।
এদিকে, গ্রেফতারকৃত গাড়িচালক মিজানুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠায় ধানমন্ডি থানা পুলিশ। আদালত শুনানি শেষে তার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।