অনুজকান্তি দাশ, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
চিত্রাঙ্কন মানুষের জন্মান্তরের নেশা। আদিম মানুষ পশু শিকার করে মনের খেয়ালে গুহার দেয়ালে ছবি এঁকে রাখত। ভ্যান গগ, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, পাবলো পিকাসো থেকে আমাদের জয়নুল, সুলতানসহ ছবি আঁকা প্রবাহমান নদীর মতোই চলছে। এমনই একজন রঙের ফেরিওয়ালা চিত্রশিল্পী হিমাদ্রী। যিনি শৈশব হতেই অনুভব করতেন প্রকৃতি, পরিবেশ, ছড়া-নদী, বন-পাহাড়, চা বাগান, ইতিহাস-ঐতিহ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের ছবি। হিমাদ্রীর হাতের শৈল্পিক ছোঁয়ায় তাই ফোটে ওঠেছে অসংখ্য জল রঙ, তেল রঙ, এক্রেলিক রঙ, স্কেচ ও মিশ্র মাধ্যমের চিত্র। চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার অশিদ্রোন ইউনিয়নের রামনগর মণিপুরিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিমাদ্রী লাল ধর। পেশায় শিক্ষকতা হলেও নেশা তার ছবি আঁকা। চাকরি ও আটপৌরে জীবনের কঠিন নিয়মের পাশাপাশি যখনই একটু সময় হয়, তখনই রঙ-তুলি নিয়ে আপন দুনিয়ায় ডুবে থাকেন তিনি। ‘এখনতো চারদিকে রুচির দুর্ভিক্ষ! একটা স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির দুর্ভিক্ষ! এই দুর্ভিক্ষের কোনো ছবি হয় না’— শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের একটি উক্তিকে মনে লালন করেই ছবি আঁকেন হিমাদ্রী। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে রঙের ফেরিওয়ালা হিমাদ্রী’র হাতে আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্ম। আমাদের নিত্য দেখা বিষয়কে নতুন উপলব্ধির জায়গায় নিয়ে গিয়ে হিমাদ্রীর আঁকা চিত্রকর্মগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে নগর জীবনে ব্যস্ত শহরের বাস্তবতার প্রতিকৃতি, সাগর তীরে আছড়েপড়া ঢেউ, আলো-আঁধারের অস্পষ্টতা, বৃষ্টির সৌন্দর্য, পাহাড়ের পাদদেশে প্রকৃতির মমতা, দূর আকাশের মেঘমালা আর মেঘে ঢাকা চন্দ্রালোকের নান্দনিকতার দৃশ্য। তার চিত্রে যেমনি ফুটে ওঠেছে দিগন্তজোড়া আকাশ, মাটি এবং প্রকৃতির মেলবন্ধন, নারীর বঞ্চনা কিংবা একাকী জীবনের যাতনা—তেমনি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে অসাধারণ মেয়েলি চিত্রকর্মে সুন্দরী নারীর মুখশ্রীর সাযুজ্য মধুরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। মনে ভালো লাগার অনুভূতি জাগিয়ে চিরচেনা বিষয়গুলোকে হিমাদ্রীর শৈল্পিক উপস্থাপনাগুলো মানুষকে কল্পলোকের জগতে নিয়ে যায় অনায়াসে। শ্রীমঙ্গল পৌর শহরের স্টেশন রোডে জন্মগ্রহণ করেন হিমাদ্রী লাল ধর। পিতা হিমাংশু ধর ও মাতা সাধনা ধরের বড় ছেলে তিনি। শহরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৯৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ হতে এইচএসসি, ২০০১ সালে সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ হতে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক এবং ২০০২ সালে একই কলেজ হতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। পরবর্তী সময়ে ঢাকা আর্ট কলেজ হতে চারু ও কারু বিষয়ে বিএফএ (প্রি-ডিগ্রি) পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে মূল চাকরির অবসরে শ্রীমঙ্গল চারুকলা একাডেমিতে শিক্ষকতা করছেন তিনি। হিমাদ্রীর বলেন, আমি এক গলিপথের শিল্পী। মেইন সড়কে উঠার দুঃসাহস কখনোই করিনি। শৈশবকাল থেকেই আমার কল্পনার ক্যানভাসে রূপসী বাংলার রঙিন ছবিগুলো মনের মতো করেই এঁকে চলেছি আজ অবধি। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমিও চিত্রিত করি সময়কে। আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, মাদক, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি প্রতিরোধে শিল্পচর্চাই হতে পারে কার্যকর হাতিহার। তাছাড়া শিল্পচর্চা মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করে এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়।