‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ :অবশ্যপাঠের সূত্র

প্রফেসর ড. মো. শাহিনুর রহমান

‘যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান

ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

এমন যুগন্ধর উচ্চারণ একজন ঋষিকল্প ব্যক্তিত্বের সম্পর্কেই উচ্চারিত হওয়া সম্ভব। অন্নদাশঙ্কর বাংলার সন্তান এবং সেইসূত্রে বাঙালি বটে; কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের মাটির সন্তান নন। তাদের বাস্তুভিটে পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলায়; কিন্তু তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তার কর্মজীবনের সিংহভাগ কেটেছে বাংলাদেশে, অর্থাত্ তত্কালীন পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। এদেশের মাটি ও মানুষকে তিনি নিবিড়ভাবে চিনতেন।

মাটি ও মানুষের সঙ্গে অবিরাম সংশ্লিষ্ট থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের সত্যিকারের মাটি ও মানুষের নেতা হয়ে ওঠার এ কাহিনি বঙ্গবন্ধুর জবানিতেই লিপিবদ্ধ আছে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। কত ত্যাগ, তিতিক্ষা, নির্যাতন-লাঞ্ছনা ভোগের মধ্য দিয়ে একজন প্রকৃত জননেতাকে তৈরি হয়ে উঠতে হয়, অসমাপ্ত আত্মজীবনী নামে শ তিনেক পৃষ্ঠার বইটি তার জাজ্বল্যমান সাক্ষ্যবহ। দুঃখ শুধু একটাই, ঘাতকদের হাতে আকস্মিকভাবে এই মহান নেতার জীবনাবসানের মতো তার আত্মজীবনীটিও অকস্মাত্ শেষ হয়ে গেছে। তিনি সেটা শেষ করে যাওয়ার সুযোগ আর পাননি, ঘূর্ণি হাওয়ার মতো সদা ভ্রাম্যমাণ ও কর্মব্যস্ত বাকি জীবনে। এ অঞ্চলের রাজনীতি যখন ধীরে ধীরে নানা কুশীলবের অংশগ্রহণে জটিল হয়ে উঠছে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা আর তাদের পদলেহী বাঙালিরা যখন সদ্য ব্রিটিশ অধীনতাপাশমুক্ত দেশে আগেকার সেই ঔপনিবেশিক পন্থাই টিকিয়ে রেখে নতুনভাবে শোষণের জাল ছড়াচ্ছে, গোপালগঞ্জের শেখ মুজিব যখন একটু একটু করে গোটা বাংলাদেশের শেখ মুজিব হয়ে উঠছেন ঠিক তখনই শেষ হয়ে যায় বইটা।

২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা আকস্মিকভাবে তার কন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে এসে পড়ে। খাতাগুলো ছিল খুবই পুরোনো, পাতাগুলো জীর্ণপ্রায় এবং লেখা অনেক জায়গায় অস্পষ্ট। খাতাগুলো পাঠ করে জানা যায়, এগুলোতে বিধৃত বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, যা তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন; কিন্তু শেষ করতে পারেননি।

মধুমতী তীরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক গৃহস্থ পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেটি ক্রমে ক্রমে কেমন করে হয়ে উঠলেন বাংলার গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা, তার প্রাথমিক পর্যায়টার অনুপুঙ্খ বিবরণ এ বইয়ে পাওয়া যাবে। জানা যাবে, কিশোর-তরুণ বয়সে যেসব নেতার কাছে তিনি রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন, কালক্রমে কেমন করে তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সর্বাগ্রগণ্য পথপ্রদর্শক নেতা হয়ে উঠলেন। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বভিত্তিক পাকিস্তান আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে যার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা, তিনি কীভাবে এবং কেন হয়ে উঠলেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্রষ্টা, তার বিশ্বস্ত প্রতিবেদন মিলবে এ বইয়ে।

এদেশের প্রতিটি লেখাপড়া জানা মানুষের, স্কুলকলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের, দলমতনির্বিশেষে প্রতিটি রাজনৈতিক নেতাকর্মীর এবং সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর প্রতিটি নেতাকর্মীর বইটি পড়া অত্যাবশ্যক। সুখের বিষয়, বইটি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজীম আল ইসলাম।

নোটিশে তানজীম আল ইসলাম বলেছেন, বইটির কিছু অংশ হলেও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এবং পুরো বইটি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নতুন প্রজন্ম একদিকে যেমন মহান এ নেতা বঙ্গবন্ধুর সঠিক জীবনী জানতে পারবে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ হবে। আমরা এ প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানাই এবং সর্বান্তকরণে সমর্থন করি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন রাজনীতিক। লেখালেখি বঙ্গবন্ধুর পেশা কিংবা নেশা নয়। বিশেষ করে স্ত্রীর অনুরোধে এবং জেলের নিষ্ক্রিয় অবসাদগ্রস্ত সময় কাটানোর জন্য তিনি লেখা শুরু করেন। লেখার জন্য জেলের ভেতরে তাকে চারটি খাতার যোগানও দিয়েছিলেন তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, যাকে জাতি ‘বঙ্গমাতা’ অভিধায় ভূষিত করেছে। পেশাদার লেখক নন বলেই বঙ্গবন্ধুর লেখনশৈলী অলংকারবহুল নয়; কিন্তু অন্তরের উত্তাপে উষ্ণ বঙ্গবন্ধুর সাদামাটা উচ্চারণ সরাসরি পাঠকের মর্মমূল স্পর্শ করে, যেভাবে তার ভাষণ এদেশের কোটি কোটি মানুষের কানের মধ্য দিয়ে মর্মে পৌঁছে গেছে চিরকালের জন্য। বঙ্গবন্ধুর চোখে দেশ ও দশকে জানতে হলে বইটা পড়তেই হবে। এ বই পৌঁছে যেতে হবে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে।

ভাগ্যিস, জাতির পিতা জেলে বসে চারটি খাতায় তার বৃত্তান্ত নিজেই লিখে গিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে যত অপপ্রচার হয়েছে, মানুষকে তার ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যত বিভ্রান্ত করা হয়েছে, সেসব অপনোদনের জন্যও বইটা পড়া উচিত।

n লেখক : ফোকলোরিস্ট, শিক্ষাবিদ এবং উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া