ডায়েরি

 

বিভা...

আজ সারাদিন তোমার ডায়েরি পড়লাম

প্রতিটি পাতায় লিখে রাখা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বিষাদ খেয়াল

স্মৃতিচারিতার সুতোয় গাঁথা একটা একটা দগ্ধ দিনের ফুল

প্রায় বেয়াল্লিশটা বছরের কথা

বড় কম কথা নয়

নয় মামুলি বিষয়।

তোমার ডায়েরি পড়ে জানলাম

নারীর পৃথিবী, নারীর সংগ্রাম

নারী কমিউনিজম, মার্কস থেকে মাও সেতুং

মনুসংহিতা এবং নারী , ধর্ম ও নারী

সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে তেভাগা সংগ্রাম

হারানো অতীত থেকে ঝাঁপানো বর্তমান ।

পদে পদে সময়ের আয়না

স্বাধীনতা হারা এক নারীর চোখ দর্পণে

দুই শতাব্দী যাপন ক্ষণের বচন

বুকজুড়ে কষ্ট তো নয় বরফের গান ।

তোমার প্রশ্নগুলো কোট করে রাখলাম বলেছিলে—

‘এমন কোন আর্দশ বা নীতি এ জগতে স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে, সব সময়ের জন্য সার্থক হয়েছে?’

আমি জানি না হয়েছে কি-না

বলেছো ‘আমার জীবনই আমার বাণী’ যদি কারো বোধগম্য না হয় তবে আমার বাণীকে অযৌক্তিক মনে হতে পারে।

বড় ভালো বললে বিসর্জিত বিবেকে

আমরা আর কতটুকু ধার্মিক থাকি?

প্রতিশোধ নেবার পালা যখন এল

তখন তুমি গান্ধীর সেই প্রত্যয় মেনে নিলে

বলে ফেললে—চোখের বদলে চোখ যদি নিতে হয়

তাহলে পৃথিবী একদিন অন্ধ হয়ে যাবে,

অহিংসা ও প্রীতির মধ্যে যে বীরত্ব নিহিত তা হিংসায় নেই,

তাই তো তোমাকেও গান্ধীর মতো নাথুরাম গডসে-কে রেহাই দিতে হলো,

তোমার কি মনে হয়নি একবার

তোমার আত্মকথা বদলে গেল?

হয়তো ভাবছিলে তুমিও গান্ধীবাদী সত্য-সাধনার উত্তরাধিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার

কিং, বিশপ টুটু’র মতো স্বদেশ বিদেশ জাতীয়ভাবনা ও বিশ্বজনীনতা মিলবার

-মেলাবার চারিত্রধর্মে একাকার ।

তুমি গুছিয়ে যতটা সুন্দরভাবে নিজেকে সামলেছিলে

কিন্তু সাহিত্যর প্রতি, বন্ধুত্বের প্রতি তোমার প্রগাঢ়তা তলানিতে এসে ঠেকেছিল,

তোমার চিলতে গোপনে বাস সামাজিক মননে ধিক্কার ছিল তাদের প্রতি

দোষ-গুণ বিচারে যারা একদম ঠোঁটের গোড়ায়

তোমার দেহ শৈল্পিকতাকে নিছক

হাম্পি বাকুরা খাজুরাহো’র মূর্তি বানিয়েছিল

বড় ভালো লাগল তোমার সূর্যাস্ত এবং চন্দ্রোদয়ের সময়কার দেহমিলনের স্মৃতির স্বর্ণখণ্ড,

বিভা’র গোপনতার দূরত্বের বিষাদের

হাজার হাজার তারাজ্বলা সুখের গভীর আকাশ। তোমার ইচ্ছেগুলো আদরগুলো মনখারাপ, গলা

চিরে চিত্কার রক্তঝরা ঠোঁট তোমার লেখা ডায়েরির ছেঁড়া পাতায় থমকে গেলাম

কী ছিল তবে?

পরের পৃষ্ঠায় কিচ্ছু নেই, শুধু আঁকিবুঁকি,

অভ্যস্ত হাতের আঁচড়ে কিছু মুখের কোলাজে ঠাসা কিছু বিকৃত মুখের অবয়ব। বুঝতে দেরি হয়নি

তুমি এক থাবলা থু থু দিয়েছিলে সেই মুখগুলোতে।

তুমি আদরের পাগল ছিলে

রূপকথার রাজকুমারের, কিন্তু বাস্তবে হয়ে গেলে প্রগতির পথে এক সংগ্রামী জীবন,

মানুষ হওয়া মানুষ করা : সমকালের অনুষঙ্গে।

পালন করতে শুরু করলে বারো মাসে তেরো পার্বণ।

কথা দিলাম বিভা তোমার দিনলিপির লাইনগুলো আমি ছড়িয়ে দেবো

চলমান সময়ে গুঁজে রাখবো না

পুরোনো তোরঙ্গে।