পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি (স.)

আজ ১২ রবিউল আউয়াল। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি (স.)। আখেরি নবি হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে তিনি পবিত্র মক্কা নগরীতে মা আমিনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। আবার ৬৩ বত্সর বয়সে এই দিনে মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ। আজ হইতে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শত বত্সর পূর্বে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার আরবের মরু প্রান্তরে মহান আল্লাহতায়ালা তাহাকে রহমাতুল্লিল আলামিন বা সমগ্র বিশ্বের রহমতস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছিলেন।

বিশ্বনবি (স.) যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন আরব দেশ নিমজ্জিত ছিল অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ঘোর তমসায়। সেই যুগকে বলা হইত ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ বা অন্ধকারের যুগ। বর্বর যুগে পাশবিক স্বভাবের তাড়নায় মানুষের মানবিক গুণাবলির অপমৃত্যু ঘটিয়াছিল। নিকষ তমসা হইতে মানবজাতিকে পরিত্রাণ করিতে, আলোর পথে লইয়া আসিতে আল্লাহতায়ালা মহানবি মোহাম্মদ (স.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। মহান আল্লাহতায়ালা মুসলমান তথা সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বাপেক্ষা প্রজ্ঞাময়, কল্যাণকর, পরিপূর্ণ জীবনবিধান-সংবলিত পবিত্রতম গ্রন্থ কোরআনুল কারিম নাজিল করেন তাহার উপর। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবি-রসুল প্রেরণ করিয়াছেন। তাহাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবি হইলেন আমাদের প্রিয় মহানবি (স.)। আরবের ঊষর মরুপ্রান্তরে শান্তি ও কল্যাণের স্নিগ্ধ বারিধারার মতো যে মহামানবের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল, তিনি কেবল আরবেই নন, সারা বিশ্বে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটাইয়াছিলেন। ইহা ছিল উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে সকল মানুষের সমমর্যাদার বিপ্লব। মানবতার বিপ্লব।

সরকারে দো আলম সাইয়িদুল মুরসালিন হজরত মোহাম্মদ (স.) ছিলেন বিশ্বমানবতার প্রতীক ও সত্য-সুন্দরের বাণীবাহক। তাহার আদর্শ ও চারিত্রিক মাধুর্যের কারণে নানা গোত্রে বিভক্ত, কলহ-বিবাদপ্রিয়, সামাজিক ও নৈতিকভাবে অধঃপতিত, যাযাবর ও বর্বর আরব জাতি একটি সুমহান জাতিতে পরিণত হয়। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বনবি (স.) ৪০ বত্সর বয়সে নবুয়ত লাভ করিয়াছিলেন। বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তাওহিদের বাণী প্রচারের দায়ে স্বজাতির নির্যাতনে নিরুপায় হইয়া জন্মভূমি ছাড়িয়া মদিনায় হিজরতে বাধ্য হইয়াছিলেন। অতঃপর ঐতিহাসিক মদিনা সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে ইহুদি, পৌত্তলিক, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের লইয়া মদিনায় একটি স্বাধীন-স্বতন্ত্র জাতি ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে তাহার আদর্শিক জাগরণ সমগ্র আরব উপদ্বীপকে নূতন আলোয় উদ্ভাসিত করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুশাসন, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। তাহার তাওহিদের এই ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে আরব জাহানে নবজীবন সঞ্চারিত হয়, নূতন সভ্যতা-সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটে এবং উদ্ভব ঘটে এক নূতন জীবনব্যবস্থার। অচিরেই এই সভ্যতা ও ঐক্য, শান্তি, সাম্য ও মানবকল্যাণের চিন্তাচেতনা সারা বিশ্বের সার্বিক চিন্তা ও জীবনধারাকে প্রভাবিত করে ব্যাপকভাবে। আল্লাহতায়ালা বিশ্বনবিকে সমগ্র বিশ্বের রহমতস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছেন। তাহার জন্ম হইতে ইন্তেকাল অবধি প্রতিটি কাজ সকল মানুষের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয়। দিনের নবি (স.) কেবল আক্ষরিক অর্থেই ইবাদত ও কোরআন পাঠের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন নাই, মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ ও শান্তির জন্য তিনি ইহার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনের কথা বলিয়াছেন। রসুলুল্লাহ (স.)-এর মর্যাদা এতই সমুন্নত যে, স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু এবং ফেরেশতাকুল তাহার প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করিয়া থাকেন।

বর্তমানে বিশ্বের দিকে দিকে অশান্তির কেতন উড়িতেছে। এই অশান্ত ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বিশ্বে বিশ্বনবির প্রদর্শিত পথই সবচাইতে সঠিক দিশা দেখাইতে পারে। আমরা সবুজ শ্যামল বাংলার প্রান্তর হইতে এই শ্রেষ্ঠ মহামানবের উদ্দেশে জানাই লাখো কোটি দরুদ ও সালাম—ইয়া নবি সালাম আলাইকা, ইয়া রসুল সালাম আলাইকা।