পিটাইতে পিটাইতে একজন অতি সাধারণ মানুষকে হত্যা করিতেছে আর একদল সাধারণ মানুষ; কিন্তু কেন? কেহ অপরাধ করিলে তো তাহার জন্য দেশে বিচারের ব্যবস্থা রহিয়াছে। তাহার পরও কেন সাধারণ মানুষ বহু ক্ষেত্রে আইন হাতে তুলিয়া লইতেছেন? কখনো কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ের অবমাননা, কখনো-বা ছেলেধরা কিংবা সাধারণ চুরির অভিযোগে গত কয়েক বত্সরে মর্মান্তিক কিছু গণপিটুনির ঘটনা ঘটিয়াছে। একজন জলজ্যান্ত মানুষকে সাপ পিটাইবার মতো নির্মমভাবে পিটাইয়া হত্যা করাটা যে কতখানি ভয়ংকর বেদনার, তাহা একমাত্র ভুক্তভোগী ব্যক্তিটিই জানেন। ইহা যেন সেই কবিতার পঙিক্তর মতো—‘কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/ কভু আশীবিষে দংশেনি যারে!’
প্রশ্ন হইল, যাহাকে হত্যা করা হইতেছে, তাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ তো প্রমাণিত নহে। অবমাননা, ছেলেধরা বা চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধে কোনো অপরাধী সাধারণ মানুষের হাতে আটক হইতেই পারেন; কিন্তু তিনি সত্যিই সেই অপরাধটি করিয়াছেন কি না—তাহা সাধারণ মানুষ তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্তে বিচার করিতে পারেন না। কারণ, তাহাতে ভুল বা অবিচারের আশঙ্কা থাকে শতভাগ। একটি মানুষ যতই সাধারণ হউক, প্রত্যেকের জীবনই মহামূল্যবান। সেই মানুষটি আপাতভাবে কোনো অপরাধ করিলেও তাহাকে তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ পিটাইয়া নির্মমভাবে হত্যা করিবে—তাহা কোনোভাবেই মানিয়া লওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, যথাযথভাবে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করিবার পূর্বে কাহাকে ‘অপরাধী’ বলাটাও অপরাধ। অথচ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, গত আট বত্সরে গণপিটুনিতে নিহত হইয়াছেন সহস্রাধিক সাধারণ মানুষ।
গণপিটুনির ইতিহাস এই বিশ্বে অনেক পুরাতন। ইতিহাস বলে, ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের শিশু অপহরণ গুজব মর্মান্তিক ছিল। ১৭৫০ সালে প্যারিসে প্রায়ই হারাইয়া যাইতেছিল শিশুরা। সেই সময় রটাইয়া যায় যে, রাজা পঞ্চদশ লুই কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হইয়াছেন এবং এই রোগের হাত হইতে মুক্তির জন্য তিনি শিশুদের অপহরণ করাইতেছেন। ইহার ফলে শিশু অপহরণের গুজব এমন পর্যায়ে ছড়াইয়া পড়িল যে, প্যারিসে দাঙ্গাহাঙ্গামা নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায়। আধুনিক সময়ে উন্নত বিশ্বে গণপিটুনির কথা চিন্তাই করা যায় না; কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে গত কয়েক দশকে গুজবের ভিত্তিতেও গণপিটুনির ঘটনা ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিশেষজ্ঞরা এই ক্ষেত্রে বলিয়া থাকেন যে, যখন একটি সমাজে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় তখন তাহারা একধরনের মানসিক অবসাদে ভোগে। তাহা হইতেও মানুষের মধ্যে এই ধরনের সহিংসতা দেখা দেয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশে যাপিত জীবনে বিভিন্ন ধরনের ক্ষোভ-হতাশা ও বঞ্চনার ভিতর দিয়া চলিতে চলিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। দেশের মানুষ নিরন্তর বিভিন্ন সহিংস দৃশ্য দেখিয়া থাকে বত্সরভর। নৃশংসতার ঘটনা নিরন্তর দেখিয়া শুনিয়া এই ধরনের ঘটনাকে তাহারা স্বাভাবিক বিষয় বলিয়া মনে করিতে শুরু করিয়াছে। বলা যায়, বাংলাদেশে গণপিটুনির ‘মব সাইকোলজি’র নেপথ্যে রহিয়াছে সাধারণ মানুষের অন্তর্নিহিত সুগভীর হতাশা।
তবে আতঙ্কের বিষয় হইল—গণপিটুনির নামে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনেক মানুষকে হত্যা করিবার ঘটনা ঘটিয়াছে। কারণ, কোনো হত্যাকে ‘গণপিটুনি’ দেখানো সম্ভব হইলেই সেই ‘অপরাধ’ সাধারণত হিমঘরে চলিয়া যায়। যদিও বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় বলা হইয়াছে, কাহাকে গণপিটুনি দিয়া হত্যা করা হইলে তাহা ‘খুন’ হিসাবে গণ্য হইবে, যাহার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে এখন পর্যন্ত গণপিটুনির মাধ্যমে সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচারের নজির নাই। যেহেতু গণপিটুনির মব সাইকোলজি তৈরির নেপথ্যে রাষ্ট্রেরও পরোক্ষ ভূমিকা রহিয়াছে, সুতরাং ইহার দায় কোনো আলোকিত রাষ্ট্রই এড়াইয়া যাইতে পারে না। ইহার সমাধানও রাষ্ট্রকেই করিতে হইবে।