সাহিত্যিক মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ

সাহিত্যিক মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর মৃত্যুদিন ২ নভেম্বর। এই দিনে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে স্মরণ করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। যে প্রতিষ্ঠানের তিনি জনক ছিলেন বলা যায়, সেই প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি থেকেও তাকে স্মরণ করার প্রচেষ্টা লক্ষণীয় নয়। এটা কি নিতান্তই বিস্মৃতি না ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা, তা এক জিজ্ঞাসা। এ জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে আমার এই ক্ষুদ্র নিবন্ধ। পারস্য প্রতিভা, মানুষের ধর্ম এবং আরো কয়েকটি পাঠকনন্দিত গ্রন্থের প্রণেতা মোহাম্মদ বরকতুল্লাহকে সাহিত্যিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই।

মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর শতবর্ষের জন্মদিন ছিল ২ মার্চ ১৯৯৮। দিনটি ছিল আমাদের কাছে খুবই বেদনাদায়ক। এর কারণ বাংলা একাডেমি তার স্মৃতি রক্ষার্থে তেমন কিছুই করেনি। অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের নামে তারা ভবন নির্মাণ করেছে, সেমিনার হল করেছে, কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির উত্সবের সময় তার ছবিটিও টাঙানো হয় না। কিন্তু বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ কখনো ভেবে দেখে না, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ বাংলা একাডেমির কে ছিলেন, কী ছিলেন। ১৯৫৫ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের অনুরোধে তিনি বাংলা একাডেমির ‘স্পেশাল অফিসার’ তথা প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বাংলা একাডেমিতে মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর কার্যকাল দীর্ঘ ছিল না। এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি ‘পরিচালক’ পদটিও লাভ করেননি। কিন্তু তাতে কি কিছু আসে-যায়? বাংলা একাডেমির আঁতুড়ঘরে তিনি ছিলেন একমাত্র পরিচর্যাকারী। এই ঐতিহাসিক স্থান অন্য কেউ দখল করে নিতে পারেন না কিংবা সেই প্রশ্ন ওঠে না। তাহলে তিনি কেন বাংলা একাডেমির কাছে এভাবে উপেক্ষিত হলেন? মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ সম্পর্কে এখানে সমাপ্তি টানা যায় না। তিনি একটি বিবৃতিতে প্রথম স্বাক্ষর দিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গ স্মৃতিকথায় তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবদুল গফ্ফার চৌধুরী। গফ্ফার চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’ থেকে একটি দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টি তুলে ধরতে চাই।

‘নূরুল ইসলামের সঙ্গে আমার (আবদুল গফ্ফার চৌধুরী) পরিচয় ও সখ্য প্রায় ৩০ বছর ধরে। ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা যখন জেলে, অসংখ্য কর্মী পুলিশের নির্যাতনের ভয়ে আত্মগোপন করেছেন, তখন যে কয়েক জন মুষ্টিমের কর্মী আওয়ামী লীগ অফিসে বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন, তাদের মধ্যে নূরুল ইসলাম একজন। আমার এক দিনের কথা মনে আছে। বঙ্গবন্ধুকে তখন ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ জড়িয়ে ঢাকা জেল থেকে কুর্মিটোলায় সেনানিবাসের বিশেষ বন্দিশালায় নেওয়া হয়েছে। চারদিকে গুজব, শেখ মুজিবকে ভারতের সঙ্গে ষড়যন্ত্র ও দেশদ্রোহের দায়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হবে। চলছে নিরাপত্তা আইনে নির্বিচার গ্রেফতার, নিপীড়ন ও সন্ত্রাস। ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। আমি তখন পুরান ঢাকার নারিন্দা লেনের একটা বাসায় থাকি। বিকেলে বাসায় এসে হাজির নূরুল ইসলাম। সঙ্গে আমেনা বেগম। আমেনা বেগম তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। নূরুল ইসলাম বললেন, ‘জানেন, আজ সারা দিন আপাকে নিয়ে টোঁ টোঁ করে সারা শহর ঘুরেছি। কখনো হেঁটে, কখনো রিকশায়। একটা গাড়ির পর্যন্ত ব্যবস্থা করতে পারিনি। মুজিব ভাইয়ের প্রকাশ্য বিচারের দাবিতে একটি বিবৃতি প্রচার করা হবে। তার মুসাবিদা করারও লোক পাচ্ছি না।’ বললাম, কেন, বাহাউদ্দিন চৌধুরী ও গাজী গোলাম মোস্তাফা কোথায়? (বাহাউদ্দীন চৌধুরী তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত)। নূরুল ইসলাম বললেন, তারাও আন্ডারগ্রাউন্ডে গেছেন। শেখ মনিও যদি এই সময়ে জেলের বাইরে থাকতেন, তাহলে আমাদের এমন অসুবিধা হতো না। :সালাম খান ও জহিরুদ্দিন সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন? এবার আমেনা বেগম মুখ খুললেন। বললেন, ‘ওদের কথা আর বলবেন না ভাই। তারা বলছেন, এমন বিবৃতি-টিবৃতি না দিয়ে চুপ থাকো। নইলে তোমাদেরও ধরে নিয়ে যাবে। আমরাও বিপদে পড়ব।’

নূরুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা আতাউর রহমান খানের কাছেও গিয়েছিলাম। তিনি যুক্ত বিবৃতিতে সই দেওয়া দূরের কথা, ইংরেজিতে বিবৃতির একটা খসড়া করে দিতেও রাজি হননি।’ বললাম, ‘সুতরাং ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো। অর্থাত্, আমাকে এই বিবৃতির খসড়া করে দিতে হবে। আমি না হয় বাংলায় লিখলাম। ইংরেজি করবে কে?’ আমেনা বেগম বললেন, ‘সেই লোক আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’ নূরুল ইসলাম বললেন, ‘আপনি বুঝতে পারছেন না গাফ্ফার ভাই, আমরা যদি এখন চুপ থাকি, তাহলে মুজিব ভাইকে ওরা গোপন ট্রাইব্যুনালে দেশদ্রোহের নামে বিচার করে ফাঁসি দেবে। লাহোর কোর্টে আইয়ুব খান নওয়াব ভিকারুল মূলকের নাতিকে কীভাবে হত্যা করেছে জানেন তো?’ : বিবৃতিতে কী বলা হবে? জিজ্ঞাসা করলাম।

আমেনা বেগম বললেন, ‘আমাদের দাবি, শেখ মুজিব ও তার সহবন্দিদের অসামরিক আদালতে প্রকাশ্যে বিচার করা হোক এবং তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার দেওয়া হোক। তাছাড়া সামরিক কাস্টোডি থেকে তাদের সিভিল জেলে স্থানান্তর করা হোক। এই দাবি শুধু আওয়ামী লীগের তরফ থেকে করা হলে গুরুত্ব পাবে না। এই বিবৃতিতে দেশের সব রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের সই সংগ্রহ করতে চাই। তাই যুক্ত বিবৃতির একটা ইংরেজি খসড়াও দরকার।’

সেদিনই যুক্ত বিবৃতির খসড়া তৈরি করলাম। এখন ইংরেজি অনুবাদ কে করবেন? আমার শ্বশুর সরকারি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। কিন্তু জামাইয়ের অনুরোধ ঠেলতে পারলেন না। তিনি ইংরেজির খসড়াটা করে দিলেন। সারা ঢাকা শহর দুই দিন যাবত্ ঘুরেও আমেনা বেগম ও নূরুল ইসলাম কোনো রাজনৈতিক নেতা, এমনকি তখনকার কোনো সাহসী বুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে যুক্ত বিবৃতিতে সই সংগ্রহ করতে পারেননি। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলেছেন, ‘আগে অন্যরা সই দিন, তারপর আমি দেব।’ এখন বিড়ালের গলায় কে আগে ঘণ্টা বাঁধে?

ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াও তখন হয় ঢাকা জেলে অথবা পুলিশ হাসপাতালে বন্দি। ‘ইত্তেফাকের’ প্রকাশনা নিষিদ্ধ। প্রেস তালাবদ্ধ। চারদিকে হতাশার ‘নিবিড় তিমির আঁকা।’ এই সময়ে ইতিহাসের সবচাইতে সাহসী মানুষের ভূমিকাটি গ্রহণ করলেন একজন নির্বিরোধ, অরাজনৈতিক সাহিত্যিক ও অবসরভোগী সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ।

শেখ মুজিব ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব বন্দির প্রকাশ্য বিচারের দাবিতে ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের প্রথম যুক্ত বিবৃতিতে মোহাম্মদ বরকতুল্লা প্রথমে সই করলেন। (আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’, দ্বিতীয় সংস্করণ, জুন ২০০৬, পৃষ্ঠা ৮৫-৮৭)।

মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বিবৃতিতে প্রথম স্বাক্ষর প্রদানের বিষয়টি আজ বারবার মনে পড়ছে। এই বিবৃতি প্রদানের জন্য তার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু তার একজন স্বজন হিসেবে মনে হচ্ছে আজ যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন, তাহলে সাহিত্যিক মোহাম্মদ বরকতুল্লাহকে বিস্মৃতির অতলান্তে চলে যেতেন না।

n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও কবি