গ্রেট ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন হওয়ার একটি মূল কারণ ছিল জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্টের শাসনব্যবস্থার প্রণয়ন। আমেরিকানরা এমন একজন শাসক চেয়েছিলেন যিনি তাদেরই একজন হবেন, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে আমেরিকার জনগণের সুখদুঃখের ভাগীদার হবেন এবং স্বৈরশাসক (Tzranny) হয়ে উঠবেন না।
সেই কারণে ১৭৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান এবং সরকারের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন (Separation of Power) করে গেছেন যাতে কেউই বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট (যার হাতে নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে) স্বৈরশাসক হয়ে উঠতে না পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেন, সেক্ষেত্রে সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে, রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (Judiciary) কিংবা আইন পরিষদ (Congress) প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ— ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকানদের নিরাপত্তার কথা বলে ছয়টি মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশে বাধা দেয় যা ছিল অসাংবিধানিক। তখন বিচার বিভাগ প্রেসিডেন্টের এই অ্যাক্টের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং উক্ত রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের আমেরিকা প্রবেশ নিশ্চিত করেন। গত ফেব্রুয়ারি ২০২০-এ, কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক আনীত ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ, সিনেট ট্রাম্পকে ৫২-৪৮ ভোটে নির্দোষ বললেও, সিনেটের অনুমোদন ব্যতীত ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কোনো প্রকার যুদ্ধে জড়াতে পারবেন না বলে হুঁশিয়ারি দেন।
দুই শতাব্দীর অধিককাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রশংসিত হলেও, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য রাজনৈতিক দল, নেতা এবং সরকারের অবশ্যই ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে; কিন্তু এক্ষেত্রে নাগরিকের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জনগণের সুচিন্তিত (thoughtful) মতামত প্রার্থী নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট তাত্পর্য বহন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে সুচিন্তিত জনগোষ্ঠীর অভাবে অনেক জাতি/রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনেও এই বিষয়টি গুরুত্ব বহন করবে। ট্রাম্পের গতবারের বিজয় একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে যে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাগরিকরা কী কী বিষয় বিবেচনা করে তাদের ভোট প্রদান করেন?
‘Ignorants are manipulated’ অর্থাত্ অজ্ঞদেরকেই বোকা বানানো যায়; কিন্তু আমেরিকার জনগণ তো অজ্ঞ নয়, হওয়ার কথাও নয়। শিক্ষার মানদণ্ডে প্রায় শতভাগ শিক্ষিত, তবে ‘quality education’ বলতে যা বুঝায় তা কতটুকু রয়েছে তা প্রশ্ন থেকে যায়। যদি সমাজব্যবস্থায় বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে ‘whatever’! অথবা ‘I don’t care’—এই মনোভাব থাকে অর্থাত্ সমাজে বা রাষ্ট্রে যা-ই ঘটুক না কেন, নিজ রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে কিংবা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে মানুষ হত্যা করছে কি না—তা নিয়ে যদি কোনো মাথাব্যথা না থাকে সেক্ষেত্রে শিক্ষায় ঘাটতি রয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে কি? শুধু বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় quality education বা সুশিক্ষাই সুবিবেচক নাগরিক তৈরি করে না।
কে হতে যাচ্ছেন পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট? বর্তমান জরিপগুলোতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন এগিয়ে থাকলেও (সর্বশেষ জরিপে ৫৫ শতাংশ জনগণের সমর্থন পেয়েছিলেন), গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে ট্রাম্পের বিজয়কে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। কেন জরিপগুলোতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে থাকে? এই বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ট্রাম্প পন্থিরা জরিপগুলোতে খুব একটা অংশগ্রহণ করে কি? এই প্রশ্নটি থেকে যায়। জো বাইডেন হয়তো অধিকাংশ সংখ্যালঘুর সমর্থন পাবেন; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের হিসাবে হোয়াইট ভোটই হচ্ছে চূড়ান্ত ফ্যাক্টর। এখনো ৭০ শতাংশ ভোট হচ্ছে হোয়াইটদের। আমেরিকানদের বিশেষ করে হোয়াইট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারী বা ভিন্নভাবে বললে ট্রাম্প যা চায় সেটাই তারা পছন্দ করছেন এবং তারা হয়তো ভোটটি ট্রাম্পকেই দিবেন।
তবে যদি বাইডেন তরুণ হোয়াইট ভোটারদের, যাদের অনেকেই উদার মতাবলম্বী, আকর্ষণ করতে পারেন, তাহলে তার ভোটের যুদ্ধে এগিয়ে থাকা সম্ভব। ট্রাম্প বা বাইডেন—যারই জয় বা পরাজয় হোক না কেন, সেটা আমেরিকার জনগণ নির্ধারণ করবেন। তবে, আমরা চাইব গণতন্ত্রের যেন জয় হয়।
n লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়