মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে এখন সবার দৃষ্টি। তবে কোনো কোনো দেশ, বিশেষ করে কোনো কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বিশেষ নজর রয়েছে এই নির্বাচনের প্রতি। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলের ওপর কিছু বিশ্বনেতার ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু
সন্দেহ নেই, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর চেয়ে আর কেউ বেশি লালায়িত নয়। ট্রাম্পের পূর্বসূরি বারাক ওবমার সঙ্গে তার সম্পর্ক মধুর ছিল না, যে কারণে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে নেতানিয়াহু তাকে ‘হোয়াইট হাউজে এযাবত্কালে ইসরাইলের সেরা বন্ধু’ অভিহিত করেন। তাই বাইডেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়াটা নেতানিয়াহুর জন্য কোনো সুখবর হবে না।
বরিস জনসন
পপুলিস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন নিজস্ব স্টাইলের জন্য ব্রিটেনের ট্রাম্প হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচিতি কুড়িয়েছেন। বাস্তবেও দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। ট্রাম্প জনসনকে একজন ‘গ্রেট গাই’ হিসেবে একবার অভিহিত করেছিলেন। ব্রেক্সিট বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি জনসনের শাসনামলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ট্রাম্প নিজেও ব্যক্তিগতভাবে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। তা সত্ত্বেও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বাইডেন ক্ষমতায় এলে আটলান্টিকের এপার-ওপার সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হবে।
শি জিনপিং
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যবিরোধ ট্রাম্পের জমানায় বিশেষ মাত্রায় পৌঁছে গেছে। চলতি বছরের গোড়ার দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়ার পর তা বিশ্বকে কার্যত অচল করে দেয়। পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ট্রাম্প একে বরাবরই ‘চাইনিজ ভাইরাস’ মন্তব্য করে এসেছেন। ট্রাম্পের সময় চীনের সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতা ক্রমেই বেড়েছে। বাণিজ্য ছাড়াও চীনের মানবাধিকার রেকর্ড, বিশেষ করে জাতিগত উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতনের বিষয়ে ওয়াশিংটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে কানাডায় চীনা বহুজাতিক কোম্পানি হুয়াওয়ের শীর্ষ নির্বাহী গ্রেফতারের পর যুক্তরাষ্ট্রে চীনের ইলেকট্রনিকস বাজার কিছুটা সংকুচিত হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি
দুজনের মধ্যে সম্পর্কও যথেষ্ট উষ্ণ। জাতীয়তাবাদ উভয়ের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মোদি যেভাবে সংখ্যালঘুদের দিকে না তাকিয়ে কেবল হিন্দু জাতীয়তাবাদ নিয়ে এগিয়ে গেছেন এবং ভোটের ময়দানে সফল হয়েছেন, একই কৌশল ট্রাম্পও কাজে লাগিয়েছেন, তবে তা অন্যভাবে। ট্রাম্প এক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসীদের উপেক্ষা করে হোয়াইট সুপ্রেমেসি ও মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইনের কার্ড ব্যবহার করেছেন। এদিক থেকে ট্রাম্প আর মোদি মানসিকভাবে একাত্ম। বিপরীতে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের অবস্থান অনেকটাই বিপরীত।
উপসাগরীয় শাসকগণ
সৌদি বাদশাহ সালমান, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ (এমবিএস) ও দুবাইর শাসক বিন যায়েদ ওবামা প্রশাসনকে যতটা অপছন্দ করতেন, ঠিক ততটাই পছন্দ করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনকে। কারণ ওবামার সময়ে ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু সমঝোতা চুক্তি থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের নেতৃত্বে ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে সিনেটের প্রস্তাবে ট্রাম্প ভোট দেন। মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের আশঙ্কা, বাইডেন নির্বাচিত হলে তিনি ওবামার যুগ ফিরিয়ে আনতে পারেন।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
২০১৫ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ছয়টি দেশের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি হওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল ইরানের সাধারণ জনতা। ট্রাম্প একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে ফিরে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এমনকি করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়ও এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেনি। ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি ইরাকে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাশেম সুলেমানি নিহত হওয়ার পর উত্তেজনার পারদ আরো ওপরে ওঠে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করবেন, নির্বাচনের মাধ্যমে হোয়াইট হাউজে ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে।