রাসুল অবমাননা: কি বলে পবিত্র কোরআন

রাসুল অবমাননা সবদিক থেকে ধিক্কার ও ঘৃণা যোগ্য। এটি এমন একটি অপরাধ যার শাস্তি আল্লাহপাক স্বয়ং নিজের হাতে নিয়েছেন। তাই এই অপরাধের কারণে বাহ্যিক ভাবে কাউকে শাস্তি প্রদানের অধিকার আল্লাহ তায়ালা কারো হাতে প্রদান করেন নি। পবিত্র কোরআন পাঠে জানা যায়, সব নবী-রাসুলের সময়ই এক দল লোক এমন থাকতো যারা আল্লাহর প্রেরিতদের অবমাননা করতো। কিন্তু বাহ্যিকভাবে তাদেরকে কোন শাস্তি দেয়ার আদেশ আল্লাহপাক দিয়েছেন এমন কোনো শিক্ষা পাওয়া যায় না। 

আমরা জানি, সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কাফেররা যেসব আজে বাজে কথা বলত এ র পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ আদেশ দিয়ে বলেছেন- ‘লোকে যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং সৌজন্য সহকারে এগুলোকে পরিহার কর।’ (সুরা মুযাম্মেল: ১০) 

বিশ্বনবীকে (সা.) কাফেরদের কটাক্ষ করার ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা স্বয়ং রাসুলুল্লাহকে (সা.) যে শিক্ষা দিয়েছেন তা হলো- ‘আমি তো জানি, তারা যা বলে তাতে তোমার অন্তর সংকুচিত হয়; সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং তুমি সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও; তোমার মৃত্যু উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত কর।’ (সুরা হিজর:  ৯৭, ৯৮ ও ৯৯) এখানে যে বিষয়টি স্পষ্ট তাহলো অবিশ্বাসীদের বিদ্রূপের কারণে মহানবী (সা.) কোনোরূপ ব্যথিত ছিলেন না বরং তিনি এই কারণে ব্যথিত ছিলেন যে, তারা যে এক আল্লাহর সঙ্গে অন্যান্য দেব-দেবীর শরীক করা শুরু করেছে তাই তাঁর হৃদয় কষ্ট পাচ্ছিল।

এছাড়া মহানবীর (সা.) কষ্টের আরেকটি কারণ হলো একদিকে আল্লাহতায়ালার প্রতি অকৃত্রিম ও গভীর  ভালোবাসা, অপরদিকে মহানবীর (সা.) জাতির জন্য উৎকণ্ঠা ও চিন্তা কারণ তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো উপাসনায়রত।  তারপরেও কিন্তু তিনি কারো বিরুদ্ধে আল্লাহপাকের কাছে কোনো শাস্তির জন্য দোয়া করেন নি বরং তিনি সবার ক্ষমার জন্য আল্লাহতায়ালার কাছে হাত উঠিয়েছিলেন।

উল্লিখিত আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় আমৃত্যু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য আদেশ হলো আল্লাহর  প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, তার পবিত্রতা ঘোষণা এবং তার ইবাদতে রত থাকা। অতএব অপমান বা অবমাননাকর আচরণের জন্য ইসলাম বাহ্যিক কোনো শাস্তির বিধান করেন নি। 

এখন দেখা যাক, রাসুল ও কোরআন অবমাননার ক্ষেত্রে উম্মতের কী করণীয়।  এ বিষয়ে  পবিত্র কোরআন আমাদের কি শিক্ষা দিয়েছে? পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন-‘আর কোরআনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি এই হুকুম জারি করে দিয়েছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াত প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে এবং এর বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত না হবে তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না; অন্যথায় তোমরাও তাদের মত হবে। মুনাফেক এবং কাফির সকলকেই আল্লাহ তো জাহান্নামে একত্র করবেন।’ (সুরা নিসা: ১৪০) 

সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অপরাধ হলো, আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করান বা শিরক করা, কিন্তু এক্ষেত্রেও ইসলাম পরমসহিষ্ণু। যেভাবে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন-‘আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তারা ডাকে তাদেরকে তোমরা গালি দিও না। কেননা তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকেও গালি দিবে। এভাবে আমি প্রত্যেক জাতির দৃষ্টিতে তাদের কার্যকলাপ সুশোভন করেছি; অতঃপর তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের প্রত্যাবর্তন। অনন্তর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে অবহিত করবেন।’ (সুরা আনআম: ১০৮) 

আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অপরাধ সত্ত্বে ও এ অপরাধের জাগতিক কোন শাস্তির বিধান নেই বরং মানুষ যাদেরকে আল্লাহতায়ালার সমকক্ষ দাঁড় করিয়েছে তাদেরকে পর্যন্ত মন্দ বলতে বা গালমন্দ করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। 

ধর্মঅবমাননার ধৃষ্টতার আরেকটি উদাহরণ দেখুন- পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- ‘তাদের যখন বলা হত, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং এরা বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব?’ (সুরা সাফফাত: ৩৬) এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, সবচেয়ে সম্মানিত, নবীকূল শিরোমণি, খাতামান্নাবেঈন রাসুলকে (সা.) ধৃষ্টরা ‘উন্মাদ’ বলার আস্পর্ধা দেখিয়েছে (নাউযুবিল্লাহ)। তা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে আল্লাহপাক কোন জাগতিক শাস্তি প্রদানের বিধানের উল্লেখ করেননি।

বিশ্বনবীর (সা.) বিরুদ্ধে কাফেররা বিভিন্ন সময় কটূক্তি করতো (নাউযুবিল্লাহ)।  এ সম্পর্কে কোরআনে উল্লেখ আছে যে, ‘এরা বিস্ময়বোধ করছে যে, এদেরই নিকট এদেরই মধ্য হতে একজন সতর্ককারী এসেছে এবং কাফেররা বলে, ‘এ তো এক জাদুকর, মিথ্যাবাদী।’ (সুরা সাদ: ০৪) এর কয়েক আয়াত পরেই আল্লাহতায়ালা আদেশ দিয়ে বলছেন-‘এরা যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর। আর প্রবল শক্তির অধিকারী আমাদের বান্দা দাউদকে স্মরণ কর। নিশ্চয় সে আল্লাহর দিকে সব সময় বিনত থাকতো।’ (সুরা সাদ: ১৭) 

লক্ষ্য করুন, উপরোক্ত আয়াতগুলোতে কাফেররা মহানবীকে (সা.) উন্মাদ এবং যাদুগ্রস্থ ব্যক্তি (নাউযুবিল্লাহ) বলা সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালা তাদের বিরুদ্ধে জাগতিক কোন শাস্তির কথা উল্লেখ করেননি। এছাড়া পূর্বের নবীদের (আ.) ক্ষেত্রেও আল্লাহপাকের একই আদেশ ছিলো। 

মূলত রাসুল অবমাননার কাজটি এমন গর্হিত এক অপরাধ যার শাস্তি আল্লাহ স্বয়ং নিজ হাতে রেখেছেন আর অপর দিকে তিনি তার রাসুলকে ধৈর্য ও উপদেশ প্রদানের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। 

তাই আমাদেরকে পবিত্র কোরআনের শিক্ষার ওপর আমল করে নিজ জীবন পরিচালনা করা উচিৎ আর নিজেদের আত্মবিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যে আমরা কতটুকু আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ভালোবাসা রাখি। 

আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় আলোকিত হয়ে নিজেদের জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দানর করুন, আমিন।

লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট