সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মন ভালো নেই’ কবিতার ছায়া এখন সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে দেখা যায়। সুনীল লিখিয়াছেন—‘মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই/ কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই/ চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি/ প্রতিদিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়।’ সত্যিই আশায় আশায় কাটে প্রতিটি দিন। সংসার-সাগর তো অধিকাংশ মানুষের নিকটই দুঃখ-তরঙ্গের খেলা, সেইখানে ‘আশা’ই হইল একমাত্র ভেলা; কিন্তু সেই আশার ভেলাও যদি ডুবিয়া যায়, তখন বোধহয় খড়কুটা আঁকড়াইয়া ধরিবার মতো আর কিছু না পাইয়া মানুষ অবশেষে আত্মহত্যা করিয়া বসে। সকল ধর্মেই বলা হইয়াছে—আত্মহত্যা মহাপাপ নরকে গমন; কিন্তু ‘পৃথিবী’টাই কাহারো নিকট নরক হইয়া গেলে সে বোধহয় আর কোনো নরকের ভয় পায় না। কিন্তু একটি শিশু বা কিশোর বয়সি কেহ যদি আত্মহত্যা করিয়া বসে, তখন বুঝিতে হইবে ইহার সমস্যা আরো গভীরে। গত দুই দিনে রাজধানীতে গলায় ফাঁস দিয়া ১৫ বত্সরের কিশোরী এবং ১৯ বত্সরের গৃহবধূসহ তিন জন আত্মহত্যা করিয়াছেন। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের করা একটি জরিপ হইতে জানা গিয়াছে, ফি বত্সর দেশে গড়ে ১০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে। আর শহরের তুলনায় গ্রামে আত্মহত্যার হার ১৭ গুণ অধিক। গ্রামে যাহারা আত্মহত্যা করেন, তাহাদের বড় অংশ অশিক্ষিত এবং দরিদ্র।
আত্মহত্যার সহিত অনেক ক্ষেত্রেই তাত্ক্ষণিক আবেগও জড়াইয়া আছে। এমনকি আত্মহত্যার খবর অধিক প্রকাশিত হইলে তাহাও আত্মহত্যার প্রবণতাকে উসকাইয়া দেয়। কিছুদিন পূর্বে একটি বৈশ্বিক সমীক্ষায় জানা গিয়াছে, বিশ্বে পূর্বের চাইতে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অধিক অবনতি হইয়াছে। মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা, রাগ, দুঃখ ও দুশ্চিন্তা বাড়িয়াছে। বিশ্বের ১৪০টি দেশের প্রায় দেড় লক্ষ লোকের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে সমীক্ষাটি করিয়াছিল যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালোপ। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হইয়াছে কিংবা দুঃখ বাড়িয়াছে—ইহার সরল অর্থ হইল মানুষের মনে স্বস্তি কমিয়াছে। সাম্প্রতিক বিশ্বে যে অস্থির এবং অশান্তির বাতাবরণ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা প্রতিফলনও ঘটিতেছে ব্যক্তিমানসে। কিছুদিন পূর্বে বিশ্বের ১৭টি রাষ্ট্রে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, প্রতি ২০ জন মানুষের মধ্যে এক জন বিষণ্নতায় ভুগিতেছে। সেই হিসাবে সমগ্র বিশ্বে এই মুহূর্তে ৩৫ কোটি মানুষ ভুগিতেছেন বিষণ্নতাজনিত অসুখে। প্রকৃতপক্ষে, মানসিক স্বাস্থ্যের যেই সকল জটিল সমস্যা বাংলাদেশে বিরাজমান, প্রয়োজন অনুযায়ী তাহার চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয় নাই। মানসিক স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত জনবলও অবিশ্বাস্য রকমের কম। ১৬ কোটি মানুষের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রহিয়াছেন ২০০ জনেরও কম। তাহা ছাড়া মানসিক সমস্যাকে গরিব জনগোষ্ঠী গুরুত্বই দেয় না। ইহা যেন তাহাদের নিকট কপর্দকশূন্য অবস্থায় অভুক্তপেটে ভাত না খাইয়া চা খাইবার মতো।
মনে রাখিতে হইবে, মানুষ প্রধানত তাহার মানসিক জগত্ লইয়া বাঁচিয়া থাকে। আর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি তথা মনের মধ্যে অসুখ দানা বাঁধিলে তাহার মতো বিপজ্জনক সমস্যা অধিক নাই। ইহা মোটেই অবহেলার বিষয় নহে।