যুক্তরাষ্ট্রে অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মঙ্গলবার ভোটাভুটি হলো। নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা এবং চাপ দুটোই আছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে যেমন আশা আছে, তেমনি সতর্কতাও আছে। প্রায় ১০ কোটি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। দেশ জুড়ে এই ভোটের হার মোট নিবন্ধিত ভোটের ৪৫ ভাগ। ১৮টি রাজ্যে এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে নিবন্ধিত ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি ভোটার ইতিমধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল ১৩৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন বা ১৩ কোটি ৬৫ লাখ। অথচ এবার নির্বাচনে আগেই এর ৭০ ভাগ ভোট পড়েছে। করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে এবার ভোট পড়ার হার অনেক বেশি। তাই প্রতিটি রাজ্যেই গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি ভোটার তাদের ভোট আগেভাগেই দিয়েছেন। এই খবর যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি চমত্কারও বটে। কারণ করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন। অর্থাত্ এতে বোঝা যাচ্ছে আমেরিকা অর্থাত্ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন করোনা ভাইরাসের হানাকে যথাযথভাবে সামাল দিতে পারেননি।
বিভিন্ন জনমত জরিপে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন এগিয়ে আছেন। কিন্তু ২০১৬ সালের পর এই জরিপকে সত্যিকারে আর বিশ্বাস করতে বা জরিপের ওপর নির্ভর করতে পারছি না। গত নির্বাচনে সবাই ধারণা করেছিলেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির তত্কালীন প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন জিতে গেছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জনমত জরিপ সেই ধারণাই দিয়েছিল। কিন্তু সব জনমত জরিপ আর রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পই জয় পেয়েছিলেন। কারণ আমেরিকায় জনগণের সরাসরি বা পপুলার ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। ইলেকটোরাল কলেজের ভোটেই নির্ধারিত হয় প্রেসিডেন্ট পদে কে আসীন হবেন। অর্থাত্ মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। মূলত প্রাচীন দাসত্ব ব্যবস্থাকে রক্ষায় ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছিল।
আমি আশাবাদী, তবে সতর্কও আছি। আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকি, মেরিল্যান্ড কিংবা ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে নয়। কিন্তু ডিসিতেই ইতিমধ্যে নিরাপত্তা সতর্কতা হিসাবে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা বাড়ি বোর্ড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন আগেই নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে রাখেন, যেভাবে শীতকালে বরফ পড়ার সময় আশ্রয়ের খোঁজ করা হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বোমা হামলার হুমকি মোকাবিলায় হেলিকপ্টার পুরো শহরের আকাশে চক্কর দিচ্ছে।
তাই সবকিছুই যে ঠিকঠাক মতো আছে তা বলা যাচ্ছে না। এ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায় না। আমি জানি কিছু স্থানে নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। আমি কখনো ভাবিনি যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে আমাকে এমন আশঙ্কা করতে হবে। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে সেই আশঙ্কা করতে হচ্ছে। তবে আমি আবার আশাবাদীও। কারণ আমি দেখেছি দেশ জুড়ে কত মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। এবার রেকর্ডসংখ্যক ভোট পড়ার ব্যাপারেও আমি আশাবাদী।
সবশেষে সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তাহলো নির্বাচনে মার্কিন জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে বা তাদের রায়কে মেনে নেওয়া হবে কি না, তাতে ফলাফল যাই হোক। আমেরিকা কিন্তু নিজেই অন্য দেশকে তাদের নির্বাচনের সময় এই পরামর্শই দিয়ে থাকে।
লেখক :যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ভাষান্তর : শিফারুল শেখ