বাজার ও ব্যাংকব্যবস্থা প্রসঙ্গ

দৈনিক ইত্তেফাকের অক্টোবর ২১ ও ২৪ তারিখের দুটি খবর পড়ে বোঝা যাচ্ছে, এই অতিমারিকাল ‘কারো জন্য পৌষ মাস, কারো জন্য সর্বনাশ’। তা-ই বোধ হয় ঘটে। সংকটে, যুদ্ধে, অতিবৃষ্টিতে, বন্যা-খরায়, ঘাটতিতে ও অব্যবস্থাপনায় একশ্রেণির লোক উপকৃত হয় আর বেশির ভাগ হয় দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর জ্বলন্ত প্রমাণ আলুর বাজার। গোল আলুর বাজারে আগুন। খবর বলছে, সিন্ডিকেট কারসাজি করে বাজার থেকে ১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আলুর কি অভাব? আলুর উত্পাদন কি কম হয়েছে? আলুর দাম নির্ধারণ করে দেওয়া কি ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছে? কোল্ডস্টোরেজের মালিকেরা কি সিন্ডিকেট করে একটা বাত্সরিক ‘চান্স’ নিয়েছে? এরকম ডজন ডজন প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে। এ প্রসঙ্গেই ১০-১২ বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। দাপুটে আমলারা দেশ চালাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা একটা বড় দেখা দিল। দেশে চালের অভাব। চালের দাম বাড়ছে। সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। চালের ব্যবসায়ীদের ‘হুমকিধমকি’ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। কী হবে ভবিষ্যতে? বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে সিদ্ধান্ত হলো। টাকা জোগাড় হয়েছে, কিন্তু চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চাল নেই, দাম চড়া। সরকারের মাথায় হাত। তখন আমার মনে আছে একটি সুন্দর গানের কথা। দেশের খ্যাতনামা ও জনপ্রিয় একজন গায়িকাকে দিয়ে গান গাওয়ানো হলো ‘আলুর’ ওপর। আলুর গুণ কী, আলু কেন খেতে হবে, আলুর সঙ্গে চালের পার্থক্য কী ইত্যাদি হচ্ছে গানের প্রতিপাদ্য বিষয়। মানুষ গান শোনে, কিন্তু তা আমলে নেয় না। তারা দেখতেই পাচ্ছে বাজারে আলুর সরবরাহ প্রচুর। আলুর কোনো অভাব নেই। দাম খুবই সস্তা। তাহলে কী হবে—চাল চাই। ভাত ছাড়া বাঙালি বাঁচে কী করে? এখন আলু খাওয়ার জন্য গানের দরকার নেই। বাজার চালে ভর্তি। বিগত ১০-১২ বছরে দেশে চালের উত্পাদন ক্রমবর্ধমান। প্রতি বছর বাম্পার ফলন হচ্ছে। তিন ফসল বছরে। স্বাধীনতার পর যোগ হয়েছে ‘বোরো’, যা এখন সবচেয়ে বড় ফসল। তিন ফসলের গুণে এবং উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি ও উচ্চফলনশীল ধানের জাত আবিষ্কারের ফলে চালে আমরা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। ‘মঙ্গা’ বলে একটা অভিশাপ ছিল, বিশেষ করে  উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে। ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসটাই ছিল মঙ্গার মাস। অগ্রহায়ণী ফসল (আমন) সামনে। কিন্তু লোকের পেটে ভাত নেই। ভিক্ষা করেও (মঙ্গা) ভাত এমনকি ভাতের ‘মাড়’ পাওয়া যায় না। অবর্ণনীয় কষ্ট মানুষের। সেই দিন গত হয়েছে। বর্তমান সরকার মঙ্গাকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। এই কৃতিত্বের দাবিদার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সহকর্মী মতিয়া চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ‘মঙ্গা’ গেল, চাল উত্পাদনে রেকর্ড হচ্ছে, শাকসবজি, মাছ-মাংস, দুধ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন প্রথম সারির দেশ। এই প্রেক্ষাপটে হঠাত্ আলু নিয়ে ছলচাতুরি কেন? রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ‘গত মৌসুমে ১ কোটি ৯ লাখ টন আলু উত্পাদন হলেও হিমাগারের মালিকেরা বলেছেন, ‘উত্পাদিত আলুর ৪০ লাখ টন হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দাম নির্ধারণের আগ পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ আলু হিমাগারগুলো থেকে বের করা হয়েছে। অর্থাত্, তখনো ১৮ লাখ টন আলু হিমাগারে ছিল।’ তাহলে প্রশ্ন, আলুর সংকট কেন? কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘এ বছর আলুর বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও হিমাগারের মালিকেরা।’ আমি বুঝলাম না ‘বাড়তি চাহিদা’ কোত্থেকে এলো? আর এরই মধ্যে আলুর দাম নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাটাই বা কোত্থেকে হলো? আমাদের অভিজ্ঞতা, সরকার দাম বেঁধে দিয়ে সেই দাম কার্যকর করতে পারে না। প্রতি বছর তা আমরা লক্ষ করি। অতি সম্প্রতি ঘটে গেল পেঁয়াজের সংকট। আলুতে আমরা ঘাটতি দেশ, এ কথা কখনো শুনিনি। পেঁয়াজে ঘাটতি আমরা। এবং বিপজ্জনক হলো, ঘাটতি মেটানোর জন্য আমরা নির্ভরশীল দু-একটি দেশের ওপর—বিশেষ করে ভারতের ওপর। ভারতে প্রায় বছরই পেঁয়াজের সংকট হয়। তখন আমরা লেজেলেজে সংকটে পড়ি। এবারও পড়েছি। পেঁয়াজের দাম মুহূর্তে মুহূর্তে বেড়েছে। ৪০, ৫০, ৮০, ১০০ টাকা কেজি করে পেঁয়াজ কিনেছে মানুষ। তখন দেখা গেল সরকার তুরস্ক, মিয়ানমার ইত্যাদি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির চেষ্টা করল। ভারতও রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য শিথিল করল। এতে সংকট কাটল। কিন্তু সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিল ৪-৫ হাজার কোটি টাকা। পেঁয়াজের আগে চালের দামের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। চালের অভাব নেই। কিন্তু কুষ্টিয়া, নওগাঁওয়ের চালকল মালিকেরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চালের দাম বাড়িয়ে দেন। আলু, পেঁয়াজ ও চাল নয়, শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে প্রতি বছর সংকট তৈরি করা হয়। বাজেটের সময় তা করেন একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা। বাজেটে কর বাড়ালে তারা তা করেন, না বাড়ালেও করেন। আর পবিত্র ঈদ উত্সব তো আছেই।

এই মুহূর্তে যখন আলুর ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে ১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেন, দুই দিন আগে পেঁয়াজের ব্যবসায়ীরা যখন ৪-৫ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেন, যখন চালের ব্যবসায়ী, উপরি ব্যবসায়ী, করোনাসামগ্রী বিক্রেতারা যখন বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটস্থ করছেন, তখন এর বিপরীতে লাখ লাখ মানুষ অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দৈনিক ইত্তেফাকের একটি খবরের (২১.১০.২০) শিরোনাম :‘করোনার প্রভাবে বেকার এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়ে আইএফসির জরিপ’। এই খবরে বলা হয়েছে, ‘কোভিড-১৯-এর প্রভাবে বাংলাদেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এমএসই) এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক বেকার হয়েছেন। সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বেকার হয়েছেন এই খাতের ৩৭ শতাংশ শ্রমিক। ৯৪ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বিক্রি এ সময় কমে গেছে।’

৫০-৬০ লাখ প্রতিষ্ঠান এই খাতে। জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২০-২৫ শতাংশ। ‘এসএমই’ অথবা ‘এমএসই’ যা-ই বলা হোক না কেন, যখন সারা দেশে উত্পাদনমুখী শিল্পের শ্রমিকেরা লাখে লাখে বেকার, অন্যান্য খাতের লোকেরা বেকার, পেশাজীবীরা কর্মহীন, লাখ লাখ লোক ব্যবসাচ্যুত, এমন একটা চরম সংকটের মুহূর্তে একশ্রেণির ব্যবসায়ী—পাইকারি, খুচরা ও আমদানিকারকেরা মানুষের দুঃখ-কষ্টকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা খোলাবাজার থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন। এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে?

এতসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে ‘এসএমই’ খাতটাকে বাঁচানো যায়। এই খাত উজ্জীবিত না হলে প্রকৃতপক্ষে বাজার পুনরুদ্ধার হবে না। কারণ এখান থেকেই বেশির ভাগ ‘ভোগ’ (কনজামশন) সৃষ্টি হয়। এই খাত উজ্জীবিত হলে ক্রয়ক্ষমতার সৃষ্টি হবে, লাখ লাখ লোক বাজারে যাবে, বাজারে বেচাকেনা বাড়বে। এতে শিল্পে জোয়ার আসবে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এই খাতকে বাঁচানোর জন্য সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এদের আর্থিক সহায়তা করতে এগিয়ে আসছে না। ব্যাংকগুলো ব্যস্ত বড়দের সেবায়। আমি এদের ‘দোষ’ দিই না। কারণ জগতের ব্যাংকগুলো বড়দের সেবার জন্যই। ব্যাংক গরিবদের, ছোট ও মাঝারিদের সাহায্য করে এমন উদাহরণ বিরল। স্বাধীনতার পর গ্রামীণ উন্নয়ন, ছোট শিল্পের সম্প্রসারণ, ছোট ছোট উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য সরকারি ব্যাংকগুলোকে গ্রামে গ্রামে শাখা খুলতে উত্সাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, তারা গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট উদ্যোগকে সাহায্য করবে দূরের কথা, বরং গ্রামাঞ্চলে আমানত সংগ্রহ করে তা শহরাঞ্চলে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই ‘এনজিওগুলো’ গ্রামে যায়, তাদের সংখ্যা বাড়ে। এমনকি ছোট ছোট ঋণ দেওয়ার জন্য গ্রামীণ ব্যাংকেরও সৃষ্টি হয়। আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে শুধু ক্ষুদ্র শিল্পে অর্থায়নের জন্য ‘বেসিক ব্যাংকের’ সৃষ্টি হয়। এর নামেই ‘স্মল ইন্ডাস্ট্রি’ আছে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার, যথেচ্ছাচার, অনিয়ম-দুর্নীতি করে ব্যাংকটিকে ভিন্নমুখী করা হয়েছে এবং তার সর্বনাশ করা হয়েছে। কৃষি ও কৃষিসম্পর্কিত ছোট ছোট গ্রামীণ উদ্যোগকে সহায়তা করার জন্য ‘বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক’-এর জন্ম। এই ব্যাংকটিকেও শেষ পর্যন্ত কার্যত বাণিজ্যিক ব্যাংকে পরিণত করে বড় বড় শিল্পের অর্থায়নের দিকে ধাবিত করা হয়। ‘বিকেবি’র ‘লড়াদশা’র জন্য এই পরিবর্তনও কম দায়ী নয়। ‘বিকেবি’র উদাহরণ সামনে রেখে উত্তরাঞ্চলের জন্য ‘রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক’ (রাকাব) প্রতিষ্ঠা করা হয় বেশ আগে। এটিও মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কোল্ডস্টোরেজ ও বড় বড় উদ্যোগে ফিন্যান্স করে। ফলে দেশে ছোট ছোট উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান খুব বেশি একটা নেই।

n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়