বিশুদ্ধ চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় দরকার

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

‘হয়তো তুমি আজ সবার পেছনে আছ, নিজের শক্তি ও বিশ্বাসের ওপর ভর করে যদি দাঁড়াতে পারো, তবে তুমি একদিন সবার সামনে থাকবে।’—কথাটা খুবই যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। এখানে শক্তি বলতে চিন্তাশক্তিকে বোঝানো হয়েছে। যেখানে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন থাকতে হবে। বিশ্বাস বলতে বিশুদ্ধ দর্শনকে বোঝানো হয়েছে। যেখানে মানবিক মূল্যবোধের উপাদানসমূহ বিবেচনায় থাকতে হবে। মানুষ কীভাবে বড় হয়। শরীরে বেড়ে ওঠার চেয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধের উপাদানসমূহ বেড়ে ওঠাকেই প্রকৃত বড় হয়ে ওঠা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বয়স বাড়বে—এটা একটি স্বাভাবিক বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া। কিন্তু বয়সের সঙ্গে মানুষের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ না ঘটলে সে বড় হয়ে ওঠাটা বিজ্ঞানসম্মতভাবে বড় হয়ে ওঠাকে অসার ও যুক্তিহীন করে। জীবনে প্রসারিত হতে হলে বড় একটা মন থাকা দরকার। যেখানে ভোগের পরিবর্তে ত্যাগের মনোভাব থাকতে হবে। নেতিবাচক ক্ষেত্রে ত্যাগ নয়, ত্যাগের মনোভাব ইতিবাচক ক্ষেত্রে থাকতে হবে। উদার মনে উদার চিন্তা তৈরি হয়, যা মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তার জন্ম দেয়। এই নতুন চিন্তা পৃথিবীতে পরিবর্তন আনে। পৃথিবীকে এগিয়ে নেয়। পৃথিবীতে পরিবর্তন আনা এতটা সহজ বিষয় নয়। পৃথিবীর প্রতিটি পরিবর্তনে বাধা এসেছে কিন্তু পরিবর্তন ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে, যারা পরিবর্তন এনেছেন, ইতিহাস তাদের মনে রেখেছে। যারা গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন চিন্তাধারা সৃষ্টি করে পরিবর্তন আনতে পারে, তারা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যায়। রবার্ট হার্জ মানুষের এ ধরনের দক্ষতাকে কনসেপচুয়াল স্কিল বলেছেন। এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া একটি অন্যতম উপাদান। একেক মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি একেক রকম। কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বিত প্রভাব থাকলে তা মানুষকে তার কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়। নতুন চিন্তা নতুন ধারণার জন্ম দেয়। এর প্রভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে। গবেষকরা তিল তিল করে তাদের চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণে সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠে।

 একটা গবেষণামনস্ক মানুষ তার চিন্তা, মেধা, মননে ও মানবিকতায় অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকে। বিজ্ঞানে চিন্তাশীলতার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি বিজ্ঞানের আবিষ্কারে মানবিকতার মূল্য রয়েছে। সৃষ্টিতে চিন্তাশীলতার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ না থাকলে সে সৃষ্টি অর্থহীন। শিল্প-সাহিত্যচর্চা মানুষের ভেতরের আত্মাকে বিশুদ্ধ করে স্বচ্ছ চিন্তার উন্মেষ ঘটায়। চিন্তার শক্তি কলমের জাদুতে এক-একটি গভীর অর্থবোধক কালো অক্ষর হয়ে মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করে। বদলে দেয় মানুষের মন। বদলে দেয় পৃথিবীর দৃশ্যপট। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও চিন্তাশক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বিত প্রভাব থাকলে ইতিবাচক ও সৃজনশীল নেতার জন্ম হয়। এই নেতৃত্ব কেবল দেশ গঠনে নয় সব ক্ষেত্রেই হতে পারে। একটি দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর সবার মধ্যে বহুমাত্রিক নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ ঘটাতে পারলে উন্নত সভ্যতার ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। এই বহুমাত্রিক নেতৃত্বের ফলাফল একটি সফল একমাত্রিক উন্নয়নের ধারাকে নিশ্চিত করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি জনগোষ্ঠী সমন্বিতভাবে নিজেদের এগিয়ে নিতে পারে। বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক নিেস একটা মালবাহী ঘোড়াকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছিলেন। এই ধরনের কাজকে বস্তুবাদের অনুসারীরা কেবল মূল্যহীন বলেই চিহ্নিত করে না বরং একে নিন্দাযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক কাজ বলেও মনে করে। তারা মনে করেন, একটি পশুর জন্য একজন প্রতিভাবান ব্যক্তির জীবন দান নিতান্তই অর্থহীন। কিন্তু বিষয়টি আসলে এমন নয় বরং মানুষের চিন্তার মধ্যে এমন কিছু ইতিবাচক উপাদান রয়েছে, যার কারণে মানুষ তার দায়বদ্ধতাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ঘোড়াকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন দান করে নিেস আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন, নৈতিক মূল্যবোধের চেয়ে মহত্ কিছু নেই। নৈতিক মূল্যবোধ হলো মানুষের দৈহিক অস্তিত্বের চেয়েও বড় কিছু, এমনকি ব্যক্তিটি যদি প্রতিভাবানও হয়ে থাকেন। এখান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার তা হলো—চিন্তাশীলতার বিষয়টি যে স্তরেই থাকুক না কেন সেখানে মানবিক মূল্যবোধের বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত হতে পারে। কেভিন কার্টার নামের একজন দক্ষিণ আফ্রিকান চিত্রসাংবাদিক ১৯৯৩-এর মার্চে সুদানের দুর্ভিক্ষের সময় একটি ছবি তোলেন।

 তিনি ছবিটির নাম রেখেছিলেন ‘The vulture & the little girl’। এই ছবিতে দেখা যায়, একটি ক্ষুধার্ত শকুন খাদ্যের অভাবে মৃতপ্রায় একটি ছোট্ট মেয়ের মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। ছবিটির জন্য কেভিনকে ‘পুলিত্জার’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। কিন্তু এত বড় সম্মান পাওয়ার পরও  কেভিন মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু এই আত্মহত্যার কারণ কী ছিল? আসলে কেভিন যখন এত বড় সম্মান পেয়ে উত্সবে মেতে ছিলেন, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তার পুরস্কার প্রাপ্তির খবর প্রচারিত হচ্ছিল, ঠিক সে সময় ফোন ইন্টারভিউর মাধ্যমে একজন জিগ্যেস করে বসেন শেষ পর্যন্ত মৃতপ্রায় মেয়েটির কী হয়েছিল? কেভিন উত্তর দেন, সেটা তিনি বলতে পারবেন না কারণ তার ফ্লাইট ধরার তাড়া ছিল এবং ছবিটি তুলেই সে জায়গাটি ত্যাগ করেছিল। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি তখন অনেকটা গম্ভীর হয়ে বলেন, ‘আমি বলছি সেদিন ওখানে দুটো শকুন ছিল, তার মধ্যে একজনের হাতে ক্যামেরা ছিল।’ এই কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করে কেভিন বুঝতে পারেন ক্যামেরা হাতে শকুনটি ছিল সে নিজে। কারণ সে ছোট মেয়েটিকে না বাঁচিয়ে তার ছবি তোলাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল। হয়তো ছবি না তুলে সেদিন কেভিন যদি মেয়েটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করত তবে কেভিনকে আজ মানবিক মূল্যেবোধের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হতো না। এতে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন, শেষে অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন। যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তার মধ্যে যদি মানবিক মূল্যবোধ সক্রিয় না থাকে, তাহলে কাজটি যতই মূল্যবান হোক না কেন তা মানুষের বিবেককে তাড়িত করবেই। মানুষের বিষয়ে প্লেটোর একটা চমত্কার দর্শন ছিল। তিনি বলতেন, ‘চিকিত্সকেরা যে ভুল করেন তা হলো তারা মনের চিকিত্সা না করে শরীর সারাতে চান। যদিও মন আর শরীর অবিচ্ছেদ্য, তাই আলাদা করে চিকিত্সা করা উচিত নয়।’ মানুষের এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে তার শরীরের কোনো মূল্য নেই। মূল্য আছে তার মনের। এই মন যদি বিশুদ্ধ চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে তা মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের জন্ম দেয়। মানুষ গড়ে ওঠে তার চিন্তায়। চিন্তার শক্তি বিকশিত হয় মানুষের মানবিক মূল্যবোধের গুণাবলিতে। চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ যখন মানুষের মধ্যে একত্রিত হয়ে কাজ করে তখন আর মানুষকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। চিন্তার মহত্ত্বে মানুষ এগিয়ে যায় তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।

n লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর