প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে সচেতন হই

তানভীর সুইটি

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সম্পদ হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। সিলেটের হরিপুরে ১৯৫৫ সালে বার্মা অয়েল কোম্পানি সর্বপ্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেন। গ্যাসের উত্তোলন শুরু হয় ১৯৫৭ সাল থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালে দেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। দেশের জ্বালানি চাহিদার শতকরা ৭৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে মেটানো হয়। অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায় যে দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে গ্যাসের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আধুনিক সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ গ্যাসের রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার ক্ষেত্র। জ্বালানি চাহিদার মূল উত্স প্রাকৃতিক গ্যাস। গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রে, বিভিন্ন শিল্প-কারখানায়, সার উত্পাদন থেকে শুরু করে গৃহস্থালি তথা রান্নাবান্নার কাজে পর্যন্ত। উত্পাদিত প্রাকৃতিক গ্যাস সহজলভ্য হওয়ায় দেশের বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রগুলোর চাহিদার এক বিশাল অংশের যোগান দিয়ে আসছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে রেখে চলছে তাত্পর্য ভূমিকা। গ্যাসের যথাযথ ব্যবহার, বণ্টন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করার সমূহসম্ভাবনা রয়েছে।

এতসব ব্যবহার সত্ত্বেও গ্যাসের অপচয় হয়েই যাচ্ছে। যার ফলে মজুতকৃত গ্যাসের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, একই সঙ্গে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসছে দ্রুতগতিতে। অপ্রয়োজনে ব্যবহূত হচ্ছে গ্যাস। নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ। আবাসিক বাসায় গ্যাস সংযোগ মিটার নেই। সামান্য একটা দেশলাইয়ের কাঠির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখা হচ্ছে চুলা। কি পরিমাণে গ্যাস পুড়ছে তার নেই কোনো হিসেব। গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি বের করার কোনো জোর প্রচেষ্টা নেই।

ইাচ্ছা থাকিলে উপায় হয়। সদিচ্ছা থাকাটা যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য জরুরি। সদিচ্ছা থাকলে সমাধান খোঁজার পথে অগ্রসর হওয়া যায়। আমাদের প্রত্যেক নাগরিককে যার যার অবস্থান থেকে গ্যাস সংকট নিরসনে তত্পর হতে হবে। সমস্যার সমাধানে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে।

জ্বালানি চাহিদা পূরণে শুধু প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে এগিয়ে আসতে হবে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এনএলজি আমদানি করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের উত্সাহিত করতে হবে বিকল্প জ্বালানির উত্স উদ্ভাবনের জন্য। সৌরশক্তি, বায়ুপ্রবাহকে ব্যবহার করা যেতে পারে জ্বালানির বিকল্প উত্স হিসেবে। বিকল্প জ্বালানির উন্নত মাধ্যম হিসেবে সুপরিচিত ও বহুল ব্যবহূত কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন প্রভৃতির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করা দরকার। কেননা, জ্বালানির এ উত্সগুলো পরিবেশের জন্য কম-বেশি ক্ষতিকর বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।

বঙ্গোপসাগরের অধিকৃত জলসীমায় রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ জ্বালানি তেল ও গ্যাস ‘গ্যাস হাইড্রেট বা জমাট বরফের স্ফটিক’-এর বিশাল ভান্ডার। প্রাকৃতিক গ্যাসের সুপার পাওয়ার গ্যাস হাইড্রেটের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আগামী দিনের জ্বালানি, অর্থনীতি ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ইতিমধ্যে জাপান গ্যাস হাইড্রেট উত্তোলন করতে সমর্থ হয়েছে। কানাডা, আমেরিকা, চীন, কোরিয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্রগুলো গ্যাস হাইড্রেট নিয়ে বহুমুখী গবেষণা চালাচ্ছে। আমাদের দেশেও যদি বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অবস্থিত গ্যাস হাইড্রেটের উত্তোলনে অগ্রসর হতে পারে তাহলে জ্বালানির উত্স হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর চাপ ও নির্ভরশীলতা উভয়ই লাঘব হবে।

আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে অন্যের ওপর দায় চাপানোর একটা অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অন্যের ওপর দায় চাপানোর এ সংস্কৃতির ইতি টানতে হবে। সকাল-সন্ধ্যা অন্যের দোষ ধরা, অন্যের খুঁত খুঁজে বের করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আত্মসমালোচনার দিকে গুরুত্বারোপ করতে হবে। সমস্যার সমাধানে নিজে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। প্রত্যেকের স্ব স্ব অবস্থান থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাসের অপচয় রোধে এগিয়ে আসতে হবে। সমস্যা সমাধানে নাগরিক উদ্যোগ কার্যকরী ও গুরুত্ববহ।

প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ করার দ্বারা দেশের উন্নয়ন হলে আমাদের উন্নয়ন হবে—এ মানসিকতা ধারণ করা শিখতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার জনগণের রয়েছে। তবে ‘এখনি ব্যবহার করে একেবারে শেষ করে ফেলতে হবে’ এমন দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতে হবে। এ সম্পদ রক্ষার্থে সরকারের দায়িত্ব অস্বীকার করার জো নেই বরং সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি বটে। সর্বোপরি,  দেশের জনগণ, যথাযথ কর্তৃপক্ষসহ সরকারের তত্ত্বাবধানেই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।