আবারও ইলিশ শিকারে নদী-সাগরে জেলেরা

ইলিশ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে গতকাল বুধবার রাত ১২টায়। এরপর গভীর রাতেই নদী ও সাগরে নেমেছেন জেলেরা। তাদের পরিবার ও গ্রামগুলোতে বিরাজ করছে উত্সবের আমেজ। সেই সঙ্গে সুখবর দিচ্ছেন মত্স্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও। তারা বলছেন, এবার নদীর পরিবেশ ভালো ছিল। মা-ইলিশ ডিম অবমুক্ত করার সুযোগ পেয়েছে পর্যাপ্ত। বাড়বে ইলিশের উত্পাদন। এ বিষয়ে আমাদের আঞ্চলিক অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো প্রতিবেদন।

বরিশাল অফিস জানায়, মা-ইলিশ রক্ষায় মত্স্য অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় মাছ শিকারে আর কোনো বাধা নেই। জেলেদের পূর্বপ্রস্তুতি অনুযায়ী, গতকাল বুধবার গভীর রাতেই ইলিশ শিকারে নদী ও সমুদ্রে নেমে পড়ার কথা তাদের।

জেলা মত্স্য অফিসের কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস জানান, গত বছরের তুলনায় এবার নদীর পরিবেশ ভালো ছিল। এবার যে পরিমাণ মা-ইলিশ ডিম অবমুক্ত করার সুযোগ পেয়েছে, তাতে ইলিশের উত্পাদন আরো বৃদ্ধি পাবে।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অমিতাভ সরকার জানান, অভিযানকালীন বিভাগের ২ লাখ ৮২ হাজার জেলে পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়েছে। জেলেরা        সচেতন হওয়ায় এবার নিষেধাজ্ঞাকালীন তারা নদীতে মাছ শিকারে নামেননি। এ কারণেও এবার ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করেন তিনি।

পাথরঘাটা (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, বৃহস্পতিবার থেকে আবারও ইলিশ ধরা শুরু হয়েছে বঙ্গোপসাগর ও স্থানীয় নদ-নদীতে। দীর্ঘ সময় পর পেশায় নামতে পেরে জেলেদের মুখেও ফুটেছে হাসি। জেলেরা আশা করছেন, ইলিশ ধরা পড়লে ঋণ ও দেনা করে চালানো সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা। পুষিয়ে নিতে পারবেন অবরোধের ক্ষতি। এদিকে প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই গত ১ নভেম্বর থেকে নদ-নদীতে আট মাস জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে জাটকা ধরা, ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও মজুত নিষিদ্ধ থাকবে। তবে বড় ইলিশ ও অন্য মাছ ধরা যাবে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, শুধু মাছ ধরাই একমাত্র পেশা হওয়ায় এই দিনগুলোতে অলস সময় পার করতে হয়েছে তাদের। ফের নদীতে নামতে পেরে তারা আনন্দিত। তাদেরও আশা, এবার প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, ইলিশ শিকারের আনন্দে মেঘনা নদীতে নেমেছেন জেলার প্রায় ৬০ হাজার জেলে। ইতিমধ্যে জেলেরা বেশ প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছেন। অবসর সময়ে ঠিকঠাক করে নিয়েছেন জাল-নৌকাসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বুধবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে নেমেছেন। নদীতে মাছ ধরা শুরু হওয়ায় জেলে পরিবারগুলোতে উত্সব বিরাজ করছে। মেঘনা নদীর গোটা উপকূলীয় এলাকার ঘাটগুলো আবার সরব হয়ে উঠেছে। যেখানে নিষেধাজ্ঞার সময় শূন্যতা বিরাজ করেছিল, সেখানে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য।

স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। বিগত বছরের চেয়ে চলতি প্রজনন মৌসুমে মা-ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পেরেছে। জেলেরা নদীতে নামেননি। প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও মত্স্য বিভাগ ছিল অনেক বেশি তত্পর। যে কারণে বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবার ইলিশ রক্ষা অভিযান অনেক বেশি সফল হয়েছে। মজু চৌধুরীর হাট মেঘনা পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, দল বেঁধে নদীতে মাছ শিকারে নামার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে ব্যস্ত জেলেরা।

প্রধান প্রজনন মৌসুমে ‘মা-ইলিশ’ রক্ষার এই উদ্যোগে গত এক দশকে দেশে ইলিশের উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ। মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উত্পাদন ছিল ২ দশমিক ৯০ লাখ টন। এক দশক পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশের উত্পাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৩ লাখ টনে। শিগিগরই উত্পাদন সাড়ে ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।