তাহাদের বিরুদ্ধে অপবাদ রহিয়াছে অঢেল, অথচ নিজেদের জীবন লইয়া বিড়ম্বনার শেষ নাই। তাহারা আমাদের ট্রাফিক পুলিশ। প্রাকৃতিক অথবা মানবসৃষ্ট হউক—যে কোনো দুর্যোগের সময়েও অবিরতভাবে দায়িত্ব পালন করিয়া যাইতে হয় তাহাদের। ভোরের আলো ফুটিতেই বাঁশি হাতে রাস্তায় নামিতে হয়। অন্য আরেক দলের তখন সময় হয় ব্যারাকে ফিরিবার। রাস্তার শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া অনিয়মিত জীবনযাপনে নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় জরাজীর্ণ ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বড় একটি অংশ। একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে সম্প্রতি জানা গিয়াছে, শব্দদূষণে শ্রবণ সমস্যায় ভুগিতেছে ৬৪ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণের সক্ষমতা উপর একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়। এই গবেষণায় প্রথমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম চারটি অঞ্চলের ২৮টি এলাকার শব্দের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। পরে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ট্রাফিক পুলিশের চারটি বিভাগের রাস্তায় দায়িত্ব পালন করা ১০০ সদস্যের কান পরীক্ষা করিয়া দেখা যায়, ৬৪ শতাংশেরই শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত। ইহার ফলে অন্তত ৪০ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। ঘুমের মধ্যেও তারা শব্দের মাত্রা অনুভব করেন। ৫৬ শতাংশ কানে সার্বক্ষণিক বিদঘুটে শব্দ পান এবং ২৭ শতাংশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবেও ঢাকায় যে কোনো রাস্তায় শব্দের তীব্রতা অনেক বেশি। একজন মানুষকে যদি আট ঘণ্টা করে ক্রমাগত ৮০ ডেসিবেলের অধিক শব্দের মধ্যে রাখিয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে ছয় মাস হইতে এক বত্সরের মাথায় লোকটির শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার হইবে। ভয়ংকর ব্যাপার হইল, উপরিউক্ত গবেষণার জন্য যেই সকল সড়ককে বাছিয়া লওয়া হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকটি এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা ১১০ ডেসিবল পাওয়া গিয়াছে। এই কারণেই বেশির ভাগ ট্রাফিক সদস্য ভুগিতে থাকেন কানের সমস্যায়। সমস্যার এইখানেই শেষ নহে, জানা যায়, ঢাকার বাতাসে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বস্তুকণা, সিসা, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, কার্বন মনোঅক্সাইডসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান দিন দিন মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পাইতেছে। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সূত্র উল্লেখপূর্বক পত্রিকান্তরে ইতিপূর্বে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়—ট্রমা, চর্মরোগ, কিডনিজনিত রোগ, শ্বাসকষ্ট এবং নাক-কান ও গলার সমস্যায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ট্রাফিক বিভাগে কর্মরতদের সংখ্যাই বেশি।
জীবন ঘষিয়া ক্ষয় করিয়া ট্রাফিক পুলিশ যেইভাবে কর্তব্য পালন করিয়া থাকেন, যেইভাবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যারাকে ফিরিয়াও ন্যূনতম শান্তি অধরাই থাকিয়া যায়, তাহার সমাধান বাহির করা জরুরি। ট্রাফিক পয়েন্টে অকারণে হাইড্রলিক হর্ন বাজানো কিংবা গাড়ির চাপ সামলাইবার সময় লেন না মানা অথবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা—ইহা আমরা হয়তো সামান্য সময়ের জন্য বাহির হইতে লক্ষ করি, কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের এই নরকে ডুবিয়া থাকিতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সড়কে শব্দদূষণে কী করিয়া সহনীয় মাত্রায় লইয়া আসা যায়, তাহা লইয়াও দিকনির্দেশনা রহিয়াছে। সেই সকল দিকনির্দেশনা কঠোরভাবে মানিয়া চলা জরুরি। অন্যথায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা আরো প্রকট আকার ধারণ করিবে অবসরোত্তর জীবনেও।