প্রশিক্ষণের সাতকাহন :স্বায়ত্তশাসন

যে  কোনো সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিকী-করণের জন্য প্রয়োজন হয় স্বায়ত্তশাসন। এই স্বায়ত্তশাসনের দুটি প্রেক্ষিত রয়েছে। প্রথমত, প্রতিটি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভিশন, মিশন ও লক্ষ্য থাকে যা বাস্তবায়নের জন্য থাকে কিছু কৌশল ও কর্মপন্থা। এসব কর্মকাণ্ডকে ঘিরে তৈরি হয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম-কানুন, ধ্যান-ধারণা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দর্শন ও কর্মপরিকল্পনা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য এবং সরকার বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত অন্যান্য দায়িত্ব সঠিক সময়ে পালনের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়। এ জন্য প্রয়োজন হয় প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন। দ্বিতীয়ত প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও পরিচালনার জন্য নিয়মিত অর্জন করতে হয় সাম্প্রতিক ও আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা ও পদ্ধতির প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন হয় নিবিড় গবেষণায় মনোনিবেশের পরিবেশ। প্রশিক্ষণের স্বার্থে প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ সুবিধাও নিশ্চিত করতে হয়। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন।

সারা দেশে অনেকগুলো সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বেসরকারি খাতের কিছু কিছু প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোনো সংস্থা বা বহুজাতিক কোম্পানি বা প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাছাড়া সেগুলোর ম্যান্ডেট খুবই সীমিত, কৃত্যভিত্তিক আবার কখনো বা মুনাফা ভিত্তিক। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃতি খুবই কম, কখনো ঢাকা বা দু-একটি শহরে সীমাবদ্ধ। আবার কিছু দেশীয় বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বৈদেশিক চাকরিদাতা কর্তৃক নির্ধারিত সিলেবাস অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজন করে থাকে। তবে কিছু কিছু এনজিওর প্রশিক্ষণ কর্মকাণ্ড সারা দেশে বিস্তৃত। কিছু এনজিও কৃত্যভিত্তিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রেখে চলেছে। আবার কিছু এনজিও প্রশিক্ষণের নামে বিদেশি উত্স থেকে অর্থ সংগ্রহে ব্যস্ত রাখছে নিজদের।

প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মপরিবেশ নিয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক উভয় পরিবেশই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার অধীনে এবং বেসরকারি পর্যায়ে অনেক প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে। সেই অর্থে বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের বিশেষত আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নেই বললেই চলে। কিছু কিছু সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের আংশিক স্বায়ত্তশাসন আছে। সেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুদান বা বরাদ্দের বাইরে নিজস্ব উদ্যোগে অর্থোপার্জন করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। সরকার কর্তৃক আইন, নীতি, কর্মপরিকল্পনা বা গাইডলাইন্স নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে কিন্তু প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আয়োজন বা ব্যবস্থাপনা সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশাসনিক বা আর্থিক দায়দায়িত্ব এবং স্বাধীনতা প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানকে না দেওয়া হলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও যেসব প্রতিষ্ঠানের মাঠ পর্যায়ে আঞ্চলিক বা শাখা কার্যালয় আছে তাদেরও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নেই।

কোনো কোনো সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানকে বছরের শুরুতেই সারা বছর আয়োজিতব্য প্রশিক্ষণ কোর্সের সংখ্যা, কোর্সের ধরন, মেয়াদ ইত্যাদি সংবলিত প্রশিক্ষণ ক্যালেন্ডার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। পরবর্তীকালে অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা কোনো প্রশিক্ষণ কোর্স এমনকি কোনো কর্মশালা বা সেমিনার আয়োজনের অনুরোধ জানালেও ঐ প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। অন্য কথায়, এসব প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থে ‘রিকোয়েস্ট কোর্স’ করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষকদের নানামূখী দক্ষতা, অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

কিছু কিছু সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটি মুখরোচক কথা প্রচলিত আছে, ‘এসব প্রতিষ্ঠানে একজন অতিথিকে এক খিলি পান খাওয়াতে হলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়’—এটি প্রতীকী হলেও প্রকৃত অবস্থাকেই ইঙ্গিত করে। অর্থ বছরের শুরুতে এসব প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন খাত-উপখাতভিত্তিক বার্ষিক বরাদ্দ প্রদান করা হয়। কিন্তু প্রতিটি কোর্স শুরুর আগে ঐ কোর্সের বিভিন্ন আইটেম-ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ প্রাক্কলন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে অগ্রিম চাওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে (কোর্সের ব্যয় একটা নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আবার সম্মতির জন্য অর্থ বিভাগে প্রেরণ করে। সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। কখনো কখনো অগ্রিম অনুমোদন হওয়ার আগেই কোর্স শেষ হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে অন্য কোর্সের বরাদ্দ থেকে ধার নিয়ে কোর্স চালাতে হয়। শেষ পর্যন্ত অগ্রিম পাওয়া গেলে এবং কোর্স সমাপ্ত হলে আবার অগ্রিম সমন্বয়ের জন্য যাবতীয় কাগজপত্রাদিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হয়। আর এজন্য প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগে প্রচুর ছোটাছুটি করতে হয়।

ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা এরূপ একটি বিধান করা হোক যেখানে একবারেই অর্থ ছাড় করে দেওয়া হবে যাতে প্রতিটি কোর্স/ইভেন্টে আলাদা আলাদাভাবে অগ্রিম নেওয়ার প্রয়োজন না হয়। সে ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ কোর্সের বিভিন্ন খাত-উপখাত বা আইটেমওয়ারি রেইট বা ব্যয়ের হার প্রতি বছরের জন্য বছরের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে দেবে এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় হলে সরকারের অডিট বিভাগ স্বাভাবিক নিয়মে আপত্তি উত্থাপন করবে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতেও মনিটরিং করা যেতে পারে। এ ছাড়াও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রকল্পের বরাদ্দ যেরুপ চার কিস্তিতে ছাড় করা হয়, সে পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের মোট প্রশিক্ষণ বরাদ্দ সমান চারটি কিস্তিতে প্রতিষ্ঠান বরাবরে ছাড় করার বিধান করা যেতে পারে। এতে কিছুটা হলেও জটিলতা এবং হয়রানি কমে যেতে পারে। তাছাড়া প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের উপর সেশন নেওয়া বা অন্য কোনো অযাচিত সুবিধা নেওয়ার সুযোগও এর ফলে কিছুটা কমে যেতে পারে।

সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সংযুক্ত সংস্থা বা স্বায়ত্তশাসিত পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো বোর্ড অব গভর্নেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও আর্থিক সহযোগিতাসহ কিছু কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হতে হয়। প্রকৃতপক্ষে এসব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে সরকারের ওপর অনেকাংশ নির্ভরশীল বিধায় ডিফেক্টো পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন সুবিধা ভোগ করতে পারে না। আবার প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। সার্বিকভাবে পুরো সমাজ প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন না করলে বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও প্রদানে আন্তরিক না হলে এ অবস্থান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দুষ্কর।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব