জুলফিকার বকুল
শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের কাঠামো ও মূল্যায়ন ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য মূলত একই। সাধারণত বিদ্যালয় বলতে আমরা বুঝি যেখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়। হতে পারে সেটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বড় একটি মিল লক্ষ করা যায়, তা হচ্ছে প্রতিটি স্তরেই ‘বিদ্যালয়’ শব্দটি যুক্ত। যেহেতু অনুধাবন ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে সম্পৃৃক্ত তাই বিভিন্ন স্তর বা ধাপ পাড়ি দিয়েই একজন শিক্ষার্থীকে এগুতে হয়। আর এর জন্য নিয়োজিত থাকেন শিক্ষক। এক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা নেই। তবে পার্থক্য জ্ঞান ও দক্ষতার।
১৯৯০ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কেউ যদি পড়ালেখা বাদ দেয়, তাহলে সে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এমন কী করতে পারবে? তাই মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। মাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষার সঙ্গে একটা যোগসূত্র তৈরি করে। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী বয়ঃসন্ধিকালে অবস্থান করে। এ সময়ে মানসিক উত্কর্ষ, উদ্যম এবং শরীর ও মনে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহের প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। আত্মসম্মানবোধ প্রখর হয়ে ওঠে। এ বয়সের প্রাণচাঞ্চল্য ভেতরের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করে। তাই এ সময়ে প্রয়োজন যথাযথ শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা। যেমন প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খেলাধুলা, ব্যায়াম, পছন্দ, অপছন্দ ইত্যাদি বিষয়ে ইতিবাচক নেতিবাচক দিক সম্পর্কে অবহিত করে ধারণা প্রদান করা। এই বয়সটায় তারা ভীষণ সংবেদনশীল থাকে। এসব দিক বিবেচনায় মাধ্যমিক শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষা অর্জন ও উন্নত জীবনের ভিত্তিস্বরূপ বলা যেতে পারে। আর জনশক্তি সৃষ্টিতে মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশের বেশিরভাগ প্রবাসী এসএসসি পাশ না হওয়ায় বহিঃবিশ্বে কর্মরত অবস্থায় নানা জটিলতায় পড়তে হয়। মাধ্যমিক শিক্ষায় অর্জিত জ্ঞান একজন মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে প্রাত্যহিক চাহিদা। এ চাহিদা পূরণে সমাজে যেমন অপরাধ প্রবণতা কমে যাবে তেমনি শহরভিত্তিক গ্রাম গঠনে সুশৃঙ্খল পরিবার ও সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
জাপানে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। এরপর তিন বছর মাধ্যমিক স্তরে পড়ালেখা করে তারপর উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করায় প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া গেলেও মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ঝরেপড়াসহ শিক্ষা গ্রহণে অনাগ্রহও লক্ষণীয়। যেহেতু আমাদের দেশে ১৮ বছরের নিচে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশকে নিরুত্সাহিত করা হয়, তাহলে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকতেই পারে।
দেশ এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত। মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতা এদেশের সরকারের রয়েছে। শুধু প্রয়োজন মাধ্যমিক শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার আন্তরিকতা এবং পদক্ষেপ নেওয়া।
মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি, মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, পাঠ্যপুস্তকের বাস্তবমুখী সংস্করণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় সন্তোষজনক সম্মানীভাতা (স্বতন্ত্র বেতন স্কেল) প্রদান ইত্যাদি উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষাকে প্রগতিশীল এবং জীবন ও কর্মমুখী করে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। শিক্ষার্থীর জীবনবোধই মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী ও উপযোগী করে তুলবে। ইতিবাচক পরিবর্তনে সবসময়ই বাধা এবং জটিলতা থাকে। তাই বলে পরিবর্তন হয়নি এমন নজির নেই।
শিক্ষক, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, গাজীপুর