রিফাত মুনীর ইতি
সামাজিক নানান কারণে ইদানীং সহজ সুন্দর সহাবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নারী নির্যাতনের পাশাপাশি কিশোর অপরাধ, মাদক পাচার ও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে, বেড়েছে শিশু নির্যাতন। আইনের শাসনের পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, যেহেতু পরিবারে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সময়কালটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শহরাঞ্চলের ব্যস্ত অভিভাবকেরা যেহেতু সন্তানদের দিতে পারেন না তাঁদের ‘মূল্যবান সময়’, সেহেতু এই সন্তানদের বেড়ে ওঠা ঝুঁকির মধ্যেই থেকে যায়। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যে সময়, সেই কিশোর বয়সটাই সবচেয়ে উপেক্ষিত এবং আমাদেরই অবহেলায় আজ হুমকির সম্মুখীন।
শিশুদের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও এটাই সত্যি যে এখনো শতকরা আশি থেকে পঁচাশি ভাগ কিশোর-কিশোরীর অভিভাবক জানেন না তাঁদের কিশোর ছেলে বা মেয়েটির বন্ধুদের খবর! এমনকি এই করোনাকালেও না। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায়, আমরা তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে ভাবছি লেখাপড়ায় সময় দিচ্ছে ছেলে বা মেয়েটি। কিন্তু আদৌ সেই সময়টুকুর খবর রাখার ব্যাপারে একরকম উদাসীন আমরা অভিভাবকরা। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই সহজ হয়ে গেছে কঠিন অপরাধী নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন প্রলোভনে তাদের অসামাজিক কার্যকলাপে সম্পৃৃক্তি ও তার বিস্তৃৃতি বাড়ছে। এ কারণে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের কাছে সুবিধাজনক মনে হচ্ছে কিশোরদের মাদক ও অস্ত্র চালানের মতো ভয়াবহ অপরাধে কাজে লাগানো।
কিশোর অপরাধ তো এক কিংবা দুই দিনের বিষয় নয়, এটি ধীরেধীরে বেড়ে ওঠা একটা শিশুর মনোজাগতিক পরিবর্তনে অপরাধের বিস্তৃৃতি। যে পরিবারে সন্তানের বেশিরভাগ সময় কাটে, সেখানে তাকে পারিবারিক অর্থসম্পদ কিংবা পারিবারিক রাজনীতি শেখানোতে একজন অভিভাবক যতটা সচেষ্ট, ততটা তাকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সচেতন কি না সেই প্রশ্ন মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা মুখে যতটা বলছি সংসারে নারী সদস্যদের প্রতি সম্মান দেখানোর কথা, ততটা কিন্তু আমাদের কিশোর ছেলেটিকে তা শেখাচ্ছি না, যতটা পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার কথা বলছি ততটা কিন্তু উদ্যোগী নই নিজের কিশোর ছেলে বা মেয়েটির সঙ্গে তার নিকটাত্মীয়দের সম্পর্কোন্নয়নে। ফলে একালের শিশুদের সঙ্গে তাদের পিতৃ কিংবা মাতৃ স্থানীয় তো বটেই, সমবয়সী তার ভাইবোনদের (মামাতো, খালাতো কিংবা চাচাতো, ফুপাতো) সঙ্গেও সম্পর্ক ততটা আত্মিক নয়।
অর্থাত্ দেখা যাচ্ছে, এগুলো আমাদের বাহ্যিক লোকদেখানো কিছু প্রতিশ্রুতির মতো হয়ে গেছে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব কমাতে একরকম ব্যর্থ আমরা, আজকের অভিভাবকেরা। এরই ফল ভোগ করতে হচ্ছে আমাদেরকে। কিশোরদের সেই মানসিক অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে পরবর্তী জীবনে। নারী নির্যাতনের মতো ঘটনায় সম্পৃক্ত হতে দেখা যাচ্ছে তাদের, তরুণ বয়সে, অবলীলায়।
আবার, কিশোর-কিশোরীদের ব্যস্ততার দিকটি খেয়াল রাখতে হবে আমাদের, তাদের উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে সহযোগী হতে হবে। বৈজ্ঞানিক নানান আবিস্কারে, সংগীত, নৃত্য ও চিত্রকলায় তাদের অংশগ্রহণে অভিভাবকদের দায়িত্ব এগিয়ে দেওয়া। বই পড়া ও লেখালিখির চর্চা, বৃক্ষরোপণ ও তার পরিচর্যাতে সময় কাটানো কিশোর ছেলে বা মেয়েটির অন্য কিছুতে প্রলুব্ধ হয়ে অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা একেবারেই কম।
সর্বোপরি, সামাজিকভাবে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও আমাদের কিছুটা দায় থেকেই যায়। কিশোর অপরাধকে গুরুত্ব দিয়ে তা প্রতিরোধে এগিয়ে এলে বড় বড় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকবে তা বলাই বাহুল্য।
ঢাকা