মেয়ের বয়স ১৮, ছেলের ২১ বছর। দুজনের মধ্যে দুবছর ধরে গভীর প্রণয়। কোনো একদিন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে ছেলেটি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ছেলেটি বিয়ে না করায় পরদিন মামলা দায়ের করে মেয়েটি। ঐ মামলায় কারাগারে জায়গা হয় ফেনীর জিয়া উদ্দিনের। নিম্ন আদালতে জামিন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন জিয়া উদ্দিন। উভয় পক্ষের বক্তব্য নিয়ে হাইকোর্ট বলেছে, বাদী (ভিকটিম) ও বিবাদী বিয়ে করতে সম্মত হলে তবেই জামিন মিলবে জিয়া উদ্দিনের। একই সঙ্গে ফেনী জেলা কারা কর্তৃপক্ষকে জেলগেটে বিয়ের আয়োজন করতে নির্দেশ দেয় আদালত। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সম্প্রতি এই আদেশ দেয়। গত মাসে রাজশাহীর একটি ধর্ষণ মামলায় সংশ্লিষ্ট ডিভিশন বেঞ্চ যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ক্ষেত্রেও একই ধরনের আদেশ দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ধর্ষণের অপরাধে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। কঠোর শাস্তি দিলেই অপরাধ কমবে। তবে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই হয়তো আদালত এ ধরনের আদেশ দিয়েছে। যেখানে ভিকটিমের স্বার্থ রক্ষা পাবে।
প্রসঙ্গত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তা হলে তিনি (মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে) দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। আইনে সংশ্লিষ্ট ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত (১৬ বছরের) অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে, অথবা (১৬ বছরের) কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তা হলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।
ফেনীর জিয়া উদ্দিনের মতো বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দিলীপের। ১২ বছর জেল খেটে কারাগার থেকে হাইকোর্টে জামিন চান। সেখানে উল্লেখ করা হয়, জামিন পেলে ভিকটিমকে বিয়ে করবেন। তাতে সম্মতি দেয় ভিকটিম। দুজনের সম্মতিতে আদালত ঐ মামলায় জেলগেটে বিয়ের ব্যবস্থা করার জন্য রাজশাহী কারাকর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। হাইকোর্ট বলেছে, বিয়ে সংক্রান্ত নথিপত্র কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে দাখিল করলেই জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। প্রসঙ্গত, ভিকটিমের ১২ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। ২০১২ সালে রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল দিলীপকে এ মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ড দিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী ইত্তেফাককে বলেন, রাজশাহী জেল কর্তৃপক্ষ এখনো রিপোর্ট দাখিল করেনি। দাখিল করলে এ মামলায় আসামির জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
চলতি বছরের ২৭ মে ফেনীর সোনাগাজী থানার জিয়া উদ্দিন (২১) বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার পার্শ্ববর্তী বাড়ির বাসিন্দা এক মেয়েকে ধর্ষণ করে। পরদিনই ভিকটিম বাদী হয়ে ধর্ষণ মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, বিবাদীর সঙ্গে আমার প্রায় দুই বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার সময় আমাকে মোবাইল ফোন করে ঘর থেকে ডেকে নেয়। আমি ঘর থেকে বের হলে বিবাদী আমাকে টেনে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। রাত ৩টার দিকে প্রেমের কথা বলে আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এ মামলায় ফেনীর জেলা ও দায়রা জজ গত ২৩ আগস্ট আসামির জামিন নামঞ্জুর করে। এরপর হাইকোর্টে জামিন চান তিনি। তার আইনজীবী ফারুক আলমগীর চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, বাদী ও বিবাদীর বয়স কম। তাদের জীবন যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য বিয়ের বিষয়টি আদালতে বলেছি। যাতে ছেলেটি জামিন পেলে মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারে। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনের যে ধারায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে সেটার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন। এই বয়সের একটি ছেলে যাবজ্জীবন সাজা হলে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না।
প্রসঙ্গত, ঝিনাইদহের লক্ষ্মীপুরে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইসলাম ভিকটিমকে বিয়ে করে সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। ভিকটিম ও তার সন্তান মিলনের বয়স ১৮ বছর। ১৮ বছর কারাভোগের পর স্ত্রী ও সন্তানকে স্বীকৃতি দেওয়ায় গত বছর আপিল বিভাগ আসামি ইসলামকে জামিন দিয়েছিল।