দক্ষিণ জনপদের মানুষের কাছে জ্ঞানচর্চার অন্যতম বাতিঘর হয়ে উঠেছে অনির্বাণ লাইব্রেরি। জগিবখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদের পাড়ে গাছপালায় ঘেরা নিভৃত এক পল্লী মামুদকাঠি। এই গ্রামের অনির্বাণ লাইব্রেরি থেকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আজ থেকে ৩০ বছর আগে ১৯৯০ সালে স্থানীয় চার যুবকের উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাইব্রেরিটি এই অঞ্চলের মানুষের জ্ঞান চর্চা এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সম্প্রতি লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্র-ছাত্রীরা ছাড়াও এলাকার নানা বয়সি শতাধিক মানুষ লাইব্রেরিতে বই ও পত্র-পত্রিকা পড়ছেন। আলোচনা করছেন সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। পাঠকদের কাছে লাইব্রেরিটি হয়ে উঠেছে মুক্ত জ্ঞানচর্চার এক অনন্য বিদ্যাপীঠ। এই লাইব্রেরিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি, নাটক, ছোটগল্প, শিশুতোষ ও রম্য রচনাসহ প্রায় সাত হাজার বই রয়েছে। লাইব্রেরিতে প্রতিদিন আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকা রাখা হয়। লাইব্রেরি ছাড়াও সদস্যদের বই বাড়িতে নিয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। জ্ঞানচর্চা, শিক্ষার প্রসার ও বিস্তারের পাশাপাশি এই অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও রূপরেখাও দেওয়া হয় এই লাইব্রেরি থেকে। সাধারণ জনগণের পাশাপাশি স্থানীয় সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রীদের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠেছে লাইব্রেরিটি। এমপি, মন্ত্রীরা এলাকায় আসলে অন্তত একবার হলেও যান লাইব্রেরিতে। একটি লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের এত আবেগ-উচ্ছ্বাস থাকতে পারে তা না দেখলে বোঝা যাবে না।
স্থানীয়রা জানান, ৩০ বছর আগের কথা। ১৯৯০ সালের কোনো এক দিন সন্ধ্যায় খুলনা জেলা সদর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের মামুদকাঠি গ্রামের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে বসে আড্ডায় মশগুল ছিলেন কয়েকজন যুবক। আড্ডা দিতে দিতে স্থানীয় মামুদকাঠি গ্রামের জয়দেব কুমার ভদ্র (বর্তমানে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা), মানিক ভদ্র, মামুদকাঠি গ্রামের বিশ্বকর্মা মণ্ডল ভোলা ও হরিঢালী গ্রামের মৃণাল ঘোষ সিদ্ধান্ত নিলেন তারা একটি লাইব্রেরি করবেন। তারা সেই লাইব্রেরির নাম রাখবেন ‘অনির্বাণ লাইব্রেরি’। এবার তাদের স্বপ্ন পূরণের পালা। নেমে পড়লেন মহত্ কর্মযজ্ঞে। শুরুতে তারা স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে যুক্ত করলেন। তারপর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শুরু করলেন বই সংগ্রহ। ১৯৯০ সালের ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে হরিসভা মন্দিরের একটি কক্ষে যাত্রা শুরু হয় ‘অনির্বাণ লাইব্রেরির’। সময়ের পথ পরিক্রমায় তাদের সেই স্বপ্নের লাইব্রেরি এখন এলাকার মানুষের কাছে আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লাইব্রেরির সদস্য খুলনা সরকারি বিএল কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা দে বলেন, আমিসহ প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী এই লাইব্রেরির সদস্য। আমরা বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসসহ ক্লাসের প্রয়োজনীয় বইপত্রও এই লাইব্রেরি থেকে পড়ার সুযোগ পাই।
এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুল আহাদ বলেন, এখানে বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালনকারীরা আমাদেরই সন্তান। তারা বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই এই লাইব্রেরির মূল পৃষ্ঠপোষক।
অনির্বাণ লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক প্রভাত দেবনাথ বলেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ লাইব্রেরির সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। তিনি জানান, লাইব্রেরির সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় ১১ শতক জমির ওপর তিনতলা ভবন তৈরি করা হয়েছে। লাইব্রেরিটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সাপ্তাহিক কোনো ছুটি নেই। শুক্র ও শনিবারই সবচেয়ে বেশি পাঠক থাকে লাইব্রেরিতে।