৫০ বছরের স্বপ্ন পূরণ জো বাইডেনের

 ‘আমি ভাগ্য মানি। ভাগ্যের ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস, বাইডেন ১৯৮৯ সালে এই কথা বলেছিলেন ন্যাশানাল জার্নাল নামে সরকারের একটি উপদেষ্টা সংস্থাকে। তিনি বলেছিলেন, আমার ব্যক্তিগত জীবন কখনই আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেনি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমি যেটা চেয়েছি, সেটা কীভাবে যেন হয়ে গেছে-একটা অদৃশ্য হাত সেটা ঘটিয়ে দিয়েছে।’ সত্যিই ভাগ্য আজ জো বাইডেনকে হোয়াইট হাউজের নেতৃত্বে নিয়ে গেছে।

২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট পদে তার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা তা নিয়ে বড় রকম সংশয় দেখা গিয়েছিল। এক কথায়, ফেব্রুয়ারিতেও তিনি ছিলেন হোয়াইট হাউজের দৌড়ে একজন পরাজিত ব্যক্তি। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার যে স্বপ্ন জো বাইডেন বহুদিন থেকে লালন করে আসছেন, তা পূরণ হওয়ার জন্য এটাই ছিল সম্ভবত তার শেষ চেষ্টা। তিনি শেষ পর্যন্ত প্রাইমারিতে জিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন।

লড়াকু বাইডেন

ঘনিষ্ঠ প্রিয়জনদের অকালমৃত্যুর অভিজ্ঞতা হয়েছে বাইডেনের জীবনে একাধিকবার। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা অর্জনে উপরে ওঠার সিঁড়ি যখন তিনি তৈরি করেছেন, সেগুলো ভেঙে পড়ছে। আবার তাকে নতুন করে সেগুলো গড়তে হয়েছে। বাইডেন প্রায়ই একটা কথা বলেন, বাবার একটা কথা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা- কে তোমাকে কতবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল, সেটা বড় কথা নয়, কত দ্রুত তুমি উঠে দাঁড়াতে পারলে, মানুষ হিসাবে সেটাই হবে তোমার সাফল্যের পরিচয়।

ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি

১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাইডেন ছিলেন ওয়াশিংটনে। তখন তার বোন ফোন করে জানান, গাড়ি দুর্ঘটনায় তার স¿ী নেইলিয়া এবং শিশুসন্তান নেওমি মারা গেছেন। গাড়িতে থাকা তার দুই ছেলে বোও আর হান্টারও গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। বাইডেন তখন সবে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। ঐ ঘটনায় তিনি একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বড় ছেলে বো বাইডেনকে হারান ২০১৫ সালে।

কৈশোর ও যৌবন

জো বাইডেনের বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। বাইডেনের জন্মের আগে তিনি ব্যবসায় সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু জো’র জন্মের পর তার ব্যবসা পড়ে যায়। জো বাইডেনের কৈশোর কেটেছে পারিবারিক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে। পেনসিলভেনিয়ায় খুবই সাদামাটা এক বাসায় যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন। তার পরিবার ছিল খুব ধার্মিক। ক্যাথলিক মূল্যবোধ ও তার ধর্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছিল পারিবারিক ধর্মচর্চার সুবাদে।

ছেলেবেলায় তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তোতলামি কাটিয়ে ওঠা। স্কুলের উঁচু ক্লাস পর্যন্ত এই সমস্যা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পড়তে গিয়ে তার তোতলামির জন্য সহপাঠীরা তো বটেই, এমনকি শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতেন। এখনও আমার মনে আছে সেই যন্¿ণার কথা, লজ্জা রাগ আর অপমানের দিনগুলোর কথা, বাইডেন লিখেছেন তার স্মৃতিকথায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে কবিতা আবৃত্তি ও সংযতভাবে কথা বলা আয়ত্ত করতে করতে, হাইস্কুল পার হওয়ার পর তোতলামো কাটিয়ে ওঠেন তিনি। হাই স্কুল শেষ করে তিনি পড়তে যান ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখান থেকে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে।

রাজনৈতিক উত্থান

কলেজেই পরিচয় হয়েছিল নেইলিয়া হান্টারের সাথে। লেখাপড়া শেষে ফিরে যান ডেলাওয়ারের উইলমিংটন শহরে। বিয়ে করেন নেইলিয়াকে। উইলমিংটনেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। একটি বড় আইনি প্রতিষ্ঠানে তিনি আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ধনী ও ক্ষমতাশালীদের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তিনি অল্পদিনেই হাঁপিয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষের হয়ে বিবাদী পক্ষে আইন লড়াইয়ের কাজ নেন তিনি। নগর পরিষদের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় রাজনীতিতে তার পথচলা। এরপর সিনেটে ১৯৭২ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে দুই মেয়াদে সিনেটর থাকা রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি সিনেটর হন। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভরাডুবি হলেও সেখানে তার এই অভাবনীয় জয়ের পর রাজনীতির অঙ্গনে তিনি তখন হয়ে উঠেছেন ডেমোক্র্যাটিক দলের সম্ভাবনাময় তরুণ।

হোয়াইট হাউজের দৌড়ে প্রথম হোঁচট

১৯৮৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জো বাইডেন ঘোষণা করেন, প্রেসিডেন্ট পদের জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাবার দৌড় থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। বাইডেনের প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার উদ্যোগ লজ্জাজনক ঘটনার কারণে হোঁচট খায়। তার বিরুদ্ধে অন্যের লেখা চুরির ও অসততার অভিযোগ আনা হলে তিনি প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

জাতীয় রাজনীতিতে

স¿ী ও শিশু কন্যার মৃত্যুর পর বাইডেন তার জীবনে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেন। তার দুই ছেলেকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ঘরে অনেক সময় দেন। প্রথম ১৪ বছর তিনি ডেলাওয়ার থেকে ওয়াশিংটন দৈনন্দিন যাতায়াত করতেন। পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন জিল জেকবস নামে এক স্কুল শিক্ষয়ত্রীকে। যিনি এখন জিল বাইডেন নামে পরিচিত এবং তিনিই এখন ফার্স্ট লেডি হচ্ছেন। তাদের একটি ছেলে হয়-অ্যাশলি। বাইডেন সিনেটের বিচার কমিটিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নিজেকে আরও  তুলে ধরতে শুরু করেন। ইরাক যুদ্ধের পর বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন বাইডেন।

প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে আবার লড়াই

২০ বছর পর আবার নতুন করে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে নামেন বাইডেন ২০০৮ সালে। তবে সেই লড়াইয়ে তিনি সফল হননি। বারাক ওবামা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পান। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে ওবামা তার ভাইস প্রেসিডেন্ট রানিং মেট হিসাবে বেছে নেন জো বাইডেনকে। কিন্তু এবার শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন বাইডেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট বা রানিংমেট হিসাবে বেছে নেন কৃষ্ণাঙ্গ-ভারতীয় বংশোদ্ভুত নারী কমলা হ্যারিসকে। প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য তার তৃতীয় প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ ৪০ বছরের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো। -বিবিসি