অণুগল্প

ব্যাটে বলে মুক্তিমন্ত্র

 

১৯৭১। ফেব্রুয়ারি। বিদায় নিচ্ছে পাকিস্তানি টিম। বিদায়ী করমর্দনের জন্য রকিবুল হাসানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন পশ্চিমাঞ্চলের অবাঙালি ক্রিকেটার আব্বাস জহির। বললেন: আবার দেখা হবে। করাচিতে।

মাথা নাড়লেন রকিবুল হাসান। কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা। বললেন: হ্যাঁ। অবশ্যই। তবে আমাদের সঙ্গে থাকবে নতুন পাসপোর্ট। আমাদের দেশের। স্বাধীন বাংলাদেশের।

জবাব শুনে বাকরুদ্ধ জহির আব্বাস। তাঁর আশপাশে আর যারা ছিল তারা সবাই। এই ছোটখাটো মানুষটা, যিনি এখনো কৈশোরের সীমানা পুরোপুরি ছাড়াতে পারেননি, তিনি এত সাহস ও অমিত তেজ পান কোথায়!

এই ছেলেটিই আগের দিন ঢাকা স্টেডিয়ামের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের টেস্ট ম্যাচ পণ্ড করে দিয়েছেন। তখন এক দেশ হলেও পাকিস্তান ক্রিকেট টিমে কোনো বাঙালি ক্রিকেটারের স্থান জুটছিল না। কিন্তু রকিবুল হাসান ঢুকে গেলেন। নিজস্ব যোগ্যতাবলেই। পাকিস্তানি টিমে একমাত্র বাঙালি খেলোয়াড়। ২৬ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭১। ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেটের টেস্ট ম্যাচ। ইন্টারন্যাশনাল টিম ভার্সাস পাকিস্তানি টিম। প্রস্তুতি সম্পন্ন। আগের দিন খেলোয়াড়দের কাছে যার যার ব্যাটও পৌঁছে গিয়েছে। রকিবুলের কাছেও।

রকিবুলের খানিকটা উত্তেজনা। টেনশনও। যে কোনো মূল্যে ভালো খেলতে হবে। বাঙালির আত্মমর্যাদা সমুন্নত করে তুলতে হবে। ব্যাটটা তুলে ধরলেন। নেড়েচেড়ে একটু দেখলেন। খেলোয়াড়ি ভঙ্গিতে। এ সময়ই নজর গেল ব্যাট ধরার হাতলের নিচে। একটা স্টিকার লাগানো। কিসের স্টিকার এটি? পাকিস্তানের তো নয়! স্টিকারে তরবারির ছবি। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নির্বাচনী প্রতীক। এটা ক্রিকেটে কেন? মেজাজ বিগড়ে গেল রকিবুলের। চুপিচুপি খবর চলে গেল চারপাশে। স্টেডিয়ামের পাশেই হোটেল পূর্বাণী। বসল গোপন বৈঠক। এলেন কলেজে বড় ভাই শেখ কামালও। এক ক্লাস ওপরে পড়তেন। রকিবুল ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে আমার সহপাঠী। আমাদের সেকশনে আবার নির্বাচিত ক্যাপ্টেনও ছিলেন।

স্টেডিয়ামে খেলার মাঠে প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। আজমত জহিরকে নিয়ে ব্যাটিং করতে নেমেছেন রকিবুল হাসান। হাতে গ্রে নিকোলাস ব্র্যান্ডের ব্যাট। সব পাকিস্তানি খেলোয়াড়ের হাতেই তাই। সেটা বিষয় নয়। ঘটনাটা অন্যরকম।

একজন ফটোসাংবাদিকের চোখ গেল রকিবুলের হাতে ধরা ব্যাটের দিকে। এর স্টিকারটা অন্য সবার মতো নয়, অন্যরকম। সে এগিয়ে গেল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। রকিবুল উঁচিয়ে ধরলেন তাঁর ব্যাট, খেলোয়াড় যেমন মাঠে নেমে উঁচিয়ে তোলে। কাছেধারে যারা সবাই দেখতে পেল স্টিকার। তাদের ধ্বনি শুনে বাকি সবাই অনুভব করল স্টিকারের উত্তাপ।

পুরো স্টেডিয়ামে একটাই ধ্বনি শত ধ্বনি তুলে বিস্ফোরিত হলো: জয় বাংলা!

কোথায় খেলা? কে দেখে খেলা? বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গ মহাগর্জনে আছড়ে পড়ছে স্টেডিয়ামের এই মহাতীরে: জয় বাংলা!

আব্বাস জহিরের চোখে বিস্ময়। পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে দেখছেন এই নব্য তরুণকে। রকিবুল হাসানের পক্ষেই তাদের মুখের ওপর এভাবে কথা বলা সম্ভব।

বছরখানেক আগেও তিনি আরো একটা কাণ্ড করেছিলেন। তা নিয়েও কম হৈচৈ হয়নি। সাহস বটে তাঁর। ঘটনাটা তাঁর এলাকায় এই পূর্বাঞ্চলে হয়নি। খোদ করাচির বুকেই পিটিয়েছেন পেশোয়ারের এক নামজাদা ক্রিকেটারকে। ক্রিকেটারের অপরাধ, তিনি বাঙালি নেতা সম্পর্কে অশোভন মন্তব্য করেছেন। ক্রিকেটার আর কেউ নন, পাকিস্তানি টিমের বাঁহাতি স্পিনার কামরান রশীদ।

রকিবুল হাসান তখন অনূর্ধ্ব ২৫ দলের ক্যাম্পে। করাচির এক টিলার ওপর ক্যাম্প। দেশে তখন আইয়ুব খানের পতন হয়েছে ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে। সামরিক শাসন জারি করে ইয়াহিয়া খানের সামরিক রাজত্ব। তরুণদের মধ্যে আড্ডায় রাজনীতি এক মুখরোচক আলোচনা।

করাচির পাহাড়ি ক্যাম্পে ক্রিকেটারদের মধ্যেও এমন আড্ডা জমে উঠেছে। কামরান রশীদ হঠাত্ এক বেফাঁস মন্তব্য করে বসলেন: আইয়ুব খান মেড এ মিসটেক। হি শুড কিলড মুজিব।

ওখানে উপস্থিত ছিলেন রকিবুল হাসান। আর যায় কোথায়! বিরাশি ছিক্কা এসে পড়ল তার ওপর। কিল চড় ঘুষি। পিটাতে পিটাতে তাকে পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে এনে ফেলা হলো। পরের দিন কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি দাঁড়াতে হলো রকিবুল হাসানকে।

মেজর সুজা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: এমন কাজ করলে কেন?

রকিবুল হাসানের সাফ জবাব: ও আমার নেতাকে বাজে কথা বলেছে। বাঙালিদের নেতাকে গাল দিয়েছে। আমাদের লিডারকে যে যতোবার এমন অসম্মান করবে, তার সঙ্গে আমি ততোবার এমন করবো।

আব্বাস জহির তাঁর চোখের দিকে তাকালেন। চোখে দীপ্তি ও স্বপ্ন। তিনি মুখ ফিরিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। মনে মনে কী বললেন: গুড বাই বাংলাদেশ?

অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য