সিলেটে দিঘির বুকে মার্কেট-অট্টালিকা

পাহাড়-টিলা, চা-বাগান আর লতাগুল্মে ভরা সিলেট ছিল ছিমছাম পরিপাটি শহর। বাড়িগুলোর সামনে ও পেছনে থাকত পুকুর বা দিঘি। সেই দিঘিতে থাকত শানবাঁধানো ঘাট। দিঘির স্বচ্ছ জল মানুষকে ভাসাত মোহমুগ্ধতায়। এই শহর একসময় পরিচিতিও পেয়েছিল দিঘির শহর নামে। সময়ের পরিক্রমায় নগরায়ণের প্রভাবে বন্ধ হচ্ছে এসব দিঘি। অবাধে গড়ে উঠছে ইট-পাথরের বহুতল অট্টালিকা। তবে এখনো টিকে থাকা কিছু দিঘি নগরীর সোনালি অতীতের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। খরতাপের সময় দিঘির স্বচ্ছ জল মহল্লাবাসীর মনে এনে দেয় শান্ত-শীতল প্রশান্তি।

নগরবাসী মনে করে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূমিখেকো চক্রের তত্পরতায় হারিয়ে যাচ্ছে দিঘি। এতে নগরীর আদি সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি পানি নিষ্কাশনব্যবস্থায় সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন সংকট। সামান্য বৃষ্টিতেই দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম বলেন, দিঘিগুলো সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে দিঘি রক্ষায় কঠোর হতে হবে।

জানা গেছে, স্বাধীনতার আগেও ছোট-বড় অন্তত ৩০টি দিঘি ছিল। ঐতিহ্যের নিদর্শন ছিল লালদিঘি, রামের দিঘি, মাছুদিঘি, বেকাদিঘি, মজুমদার দিঘি, দস্তিদারবাড়ি দিঘি, সাগরদিঘি, চারাদিঘি, ধোপাদিঘি, রাজার মাই দিঘি, মুরারিচাঁদ দিঘি, ইন্দ্রাণী দিঘি, কাজলদিঘি, কাষ্ঠঘর দিঘি, কাজিরদিঘি, ব্রাহ্মণশাসন দিঘি, লালাদিঘি প্রভৃতি। মানুষের মুখে মুখে এসব নাম এখনো স্পষ্ট উচ্চারণ হলেও অনেকগুলোর অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে।

নগরীর প্রাণকেন্দ্রে ছিল বেকাদিঘি। ঐতিহাসিক কিনব্রিজের পূর্বে ও সার্কিট হাউজের পাশে ছিল এর অবস্থান। সেখানে সিটি করপোরেশন গড়ে তুলেছে জালালাবাদ পার্ক। পার্কটিও পড়ে আছে পরিত্যক্ত। মজুমদার দিঘিতে বানানো হয়েছে খেলার মাঠ। একই পরিণতি হয়েছে মাছুদিঘিরও। নগরীর মির্জা জাঙ্গাল ও তালতলার পাশে ব্যক্তিমালিকানাধীন সুবিস্তৃত এই দিঘির নামে আবাসিক এলাকার নামকরণ হয়েছে। ধনাঢ্য ব্যক্তি দিঘিটি ভরাট করেছেন। লালদিঘিতে গড়ে উঠেছে মার্কেট। রামের দিঘির বুকে এখন বহুতল ভবন। ধোপাদিঘিটিরও চতুর্দিক ভরাট করে স্থাপনা গড়ছে সিসিক। এই দিঘির পাশে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। নগরীর নাইওরপুল এলাকায় রামকৃষ্ণ মিশনের পাশে কাজলদিঘি। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ কাজলের নামে এই কাজলদিঘির পাশে কাজলের স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত হয় স্মৃতিসৌধ। কিন্তু রাস্তা বড় করতে গিয়ে দিঘির একাংশ ভরাট করতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর বলেন, সরকারি-বেসরকারি সব দিঘিই ভরাট করা আইনত নিষিদ্ধ। দিঘিগুলো সুরক্ষায় জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান জানান, নগরীতে কতটি দিঘি রয়েছে, সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে দিঘি রক্ষায় সিটি করপোরেশন সচেষ্ট।