দূরত্ব ১০ মিনিট কমাতেও জালিয়াতি, শিক্ষা উপমন্ত্রীর জাল স্বাক্ষর

শিক্ষক বদলি জালিয়াতিতে জড়িত সিন্ডিকেট!

আজিমপুর গভ. গার্লস স্কুল থেকে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল—সরকারি এ দুটি স্কুলের মধ্যকার দূরত্ব হেঁটে ১০ মিনিটের পথ। বাসে দুই মিনিট। এই দূরত্বও এক শিক্ষকের জন্য অনেক পথ মনে হয়। তাই তিনি আজিমপুর গভ. গার্লস স্কুল থেকে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে বদলির জন্য ‘কঠিন’ এক পথ ধরে এগুতে থাকলেন। সে পথ জালিয়াতির।

এই শিক্ষকের নাম কে এম মাহমুদুল হাসান। তিনি আজিমপুর গভ. গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক। থাকেন মোহাম্মদপুরে। এই শিক্ষকের কথায়, মোহাম্মদপুর থেকে আজিমপুর গভ. গার্লস স্কুলে আসতে কষ্ট হয়। এ কারণে তিনি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে বদলির জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেন। বদলি নিশ্চিত করতে যুক্ত করে দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সিল ও স্বাক্ষর। কিন্তু ঐ ‘সিল’ ও ‘স্বাক্ষর’ জাল। সিল ও স্বাক্ষরে এতটাই মিল, যাতে খোদ উপমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েই জাল সিল ও স্বাক্ষরের বিষয়ে নিশ্চিত হতে হয়। এর আগে এই শিক্ষক মুন্সীগঞ্জের একটি স্কুল থেকে বদলি হয়ে আজিমপুর গভ. গার্লস স্কুলে এসেছিলেন।

ফাতেমা আক্তার কুমিল্লার বেগম আমেনা সুলতান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক। স্বামীর কর্মস্থল ঢাকায় হওয়ায় ঢাকায় বদলির জন্য তিনিও আবেদন করেছেন। তার আবেদনপত্রেও শিক্ষা উপমন্ত্রীর জাল সিল ও স্বাক্ষর।

এই দুই শিক্ষককে প্রাথমিকভাবে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। মাহমুদুল হাসানকে নেত্রকোনার এমকেসিএম পাইলট গভ. হাইস্কুল ও ফাতেমা আক্তারকে হবিগঞ্জের গোবিন্দপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। এছাড়া গতকাল দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। স্বাক্ষর জালিয়াতির সঙ্গে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল জড়িত আছে কি না, তা অনুসন্ধান করবে এই কমিটি।

মাউশির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষকরা বদলির জন্য আবেদন করলে বদলি নিশ্চিত করা হবে এমন দাবি করে তাদের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আগেই নিয়ে নেয়। পরে মন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে মাউশির মহাপরিচালকের কর্মচারীরা। এ জালিয়াতির সঙ্গে শিক্ষকরা জাড়িত থাকেন না।

ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীর নির্দেশ, বাস্তবায়ন সাত মাস পর :গত বছর অক্টোবরে অভিযুক্ত শিক্ষকরা বদলির জন্য আবেদন করেন। বিষয়টি প্রমাণ পাবার পর শিক্ষা উপমন্ত্রী চলতি বছরের মার্চে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাউশির মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত ৫ অক্টোবর এই দুই শিক্ষককে শাস্তিমূলক বদলি করেন। প্রশ্ন উঠেছে, সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয় প্রমাণ পাওয়া ও উপমন্ত্রীর নির্দেশ দেওয়ার পর এত দেড়ি হলো কেন? তাহলে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে কি আরো বড় কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছেন?

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, স্বাক্ষর জাল হতে পারে বিষয়টি সন্দেহ হয়েছে। এ কারণে উপমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছিল। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেড়ি হলো কেন—এমন জবাবে মাউশির মহাপরিচালক বলেন, এ সময়ে তদন্ত কমিটি কাজ করেছে।

জালিয়াতির নেপথ্যে সিন্ডিকেট : মাউশিকে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। আর মাউশির মহাপরিচালকের দপ্তরের দুই-একজন কর্মচারী এই অনিয়মে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বদলির জন্য মহাপরিচালককে বিভিন্ন কৌশলে প্রভাবিত করে তারা। দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রার্থীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বদলি বা নিয়োগ বাণিজ্য করলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তবে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মাউশির মহাপরিচালকের পিয়ন জুয়েলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

মাউশির কয়েক জন কর্মকর্তা জানান, কর্মচারী জুয়েলের বিরুদ্ধে সরকারী হাইস্কুলের শিক্ষক ও কর্মচারী বদলি, সদ্য সরকারিকৃত স্কুল শিক্ষকদের সনদ ও তথ্য বদলে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জুয়েলের রাজধানীতে ফ্ল্যাট রয়েছে বলে কয়েক জন কর্মচারী জানিয়েছেন।

মাউশি অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. রুহুল মোমিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগে জুয়েলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, মাউশির লিফটম্যান থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের নিয়ে একাধিক সিন্ডিকেট কাজ করছে। মাউশিতে থাকা এক কর্মকর্তা ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ে বদলি হয়ে গেলেও তিনি এখনো একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি এমপিওর নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।