ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সম্প্রতি জারি করা অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করতে সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ২০২০’ উত্থাপন করা হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা গতকাল রবিবার সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন। পরে পরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিলটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রতিমন্ত্রীর বিলটি উত্থাপনের আগে সংসদে এসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি তোলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সংসদ অধিবেশন না থাকাকালে জারিকৃত যে কোনো অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরদিন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করেন।
২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) উপধারায় বলা হয়, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। সংশোধিত আইনের খসড়ায় ৯(১) উপধারায় ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
আইনের ৯(৪) (ক) উপধারায় ছিল, ‘যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করিয়া মৃত্যৃ ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।’ এই উপধারা সংশোধন করে উপস্থাপিত বিলে ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’-এর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো যোগ করা হয়েছে।
বিলে অপরাধের শিকার ব্যক্তির পাশাপাশি ‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির’ মেডিক্যাল পরীক্ষা করার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৩২ ধারার সঙ্গে ৩২(ক) শিরোনামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে বিলে।
সেখানে বলা হয়, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ধারা ৩২-এর অধীন মেডিক্যাল পরীক্ষা ছাড়াও উক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, ২০১৪ সালের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইনের বিধান অনুযায়ী তার ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।
মাদক মামলার বিচারে সংশোধিত বিল উত্থাপন
মাদক মামলার বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান বাদ দিয়ে তৈরি সংশোধিত আইনের খসড়াও গতকাল সংসদে ওঠে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২০’ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে সেটি পরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা আছে, সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করবে এবং প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগ করা হবে। কোনো জেলায় অতিরিক্ত জেলা জজ না থাকলে ঐ জেলায় দায়রা জজ নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করবেন। আর ট্রাইব্যুনাল স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তি করবেন।
তবে প্রশাসনিক কারণে এখনো মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন বা জেলা বা দায়রা জজকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে অসংখ্য মামলা হলেও তা বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে, মামলার সংখ্যাও বাড়ছে।
বিলে বলা হয়েছে, এক্তিয়ারসম্পন্ন আদালতকে মামলা প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। কেউ আপিল করতে চাইলে রায় দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা করতে হবে।
এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত আইনের অধীন অপরাধগুলো গুরুত্ব অনুযায়ী ‘এক্তিয়ারসম্পন্ন’ আদালতে বিচার্য হবে। সংশ্লিষ্ট দায়রা জজ, মহানগর দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তার এক্তিয়ারাধীন এলাকায় মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিচারের জন্য প্রয়োজনে এক বা একাধিক এক্তিয়ারসম্পন্ন আদালত নির্দিষ্ট করবেন। ফলে মাদক আইনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাবে।