করোনা মহামারির পর ট্রেন চলাচল শুরু হলে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেড়ে গেছে। গত এক মাসে ঢাকা-চট্টগ্রামে চলাচলকারী সোনার বাংলা ও সুবর্ণ এক্সপ্রেস অন্তত ১০ বার আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ভাঙছে ট্রেনের জানালা আর আহত হচ্ছেন যাত্রীরা। শুধু যাত্রী নয়, ট্রেনের লোকোমাস্টার ও গার্ডরাও আহত হচ্ছেন।
হঠাত্ করে কেন চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বেড়ে গেল? রেলওয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু আড্ডার ছলে কিশোররা এই পাথর নিক্ষেপ করছে না। এর পেছনে কিছু ষড়যন্ত্রও খুঁজে পেয়েছেন তারা। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা অনুসন্ধানে দেখেছি, ঢাকা-চট্টগ্রামে চলাচলকারী বাসে যাত্রী কমে গেছে। করোনার কারণে অনেকেই ট্রেনে যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এরপর পাশাপাশি ভাঙা জানালার গ্লাস বেশি দামে কিনতে ঠিকাদারদের চক্রান্তও থাকতে পারে। এই বিষয়ে আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান চলছে। নিশ্চিত হওয়ার পর পুরোপুরি বলা যাবে।’
এ মাসেই রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোন থেকে রেলওয়ে পুলিশের কাছে চিঠি দিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। হঠাত্ করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা কেন বেড়ে গেছে, সে বিষয়েও অনুসন্ধান করতে অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি কীভাবে নিরাপত্তা আরো জোরদার করা যায় সেদিকেও নজর দিতে অনুরোধ করেছেন কর্মকর্তারা।
রেলওয়ের পুলিশ সুপার (পূর্বাঞ্চল) নওরোজ হাসান তালুকদার বলেছেন, পুলিশ দিয়ে তো পুরো রেললাইন পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে গিয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতামূলক অনেক সভা করেছি। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহা-ব্যবস্থাপক সরদার সাহাদাত আলী বলেন, পাথর নিক্ষেপের কারণে আমরা প্রতিদিনই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছি। গত এক মাসে দেখা গেছে, সোনার বাংলা ও সুবর্ণ এক্সপ্রেসে পাঁচবার করে আক্রান্ত হয়েছে। এতে যাত্রী ছাড়াও দুই জন ইঞ্জিন চালক আহত হয়েছেন। একজন গার্ডও গুরুতর আহত হন। সুবর্ণ এক্সপ্রেসের গার্ড এ হক ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে পাথর মারাটা ট্র্যাডিশন হয়ে গেছে। মহানগর এক্সপ্রেসের লোকোমাস্টার রুহুল কুদ্দুস বলেন, পাথরের আঘাতে কাঁচ ভেঙে আমাদের গায়ে পড়ে। আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত পথে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে বলেও জানান তিনি।
পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের বিভাগীয় ম্যানেজার সাদেকুর রহমান বলেন, এই পাথর নিক্ষেপের ফলে যাত্রীদের পাশাপাশি আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ভয় পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে রেলওয়ের পক্ষ থেকে জিআরপির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে রেল মন্ত্রণালয় থেকে একটা হিসাব প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, শুধু পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় গত পাঁচ বছরে ট্রেনের ২ হাজারের বেশি জানালা-দরজার কাচ ভেঙেছে। এসব মেরামতে বছরে পৌনে ২ কোটি খরচ হচ্ছে। প্রতি বছর ঢিলের আঘাতে ট্রেনযাত্রী আহত হওয়ার দেড় শতাধিক ঘটনা ঘটছে। গত বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী উত্তরাঞ্চল ভ্রমণের সময় তার ট্রেনেও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
২০১৩ সালের ১০ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে নিহত হন প্রকৌশলী প্রীতি দাশ। ওই দিন চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা তুর্ণা-নিশীথা ট্রেনের জানালার পাশে বসেছিলেন প্রীতি। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ট্রেনটি ভাটিয়ারির ভাঙ্গা ব্রিজ এলাকায় পৌঁছানোর পর জানালা বরাবর পাথর ছোড়া হয়। একটি পাথর তার মাথায় লাগে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিত্সকরা প্রীতিকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রীতির মৃত্যুর পর ট্রেনে পাথর ছোড়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। গত বছরের ৩০ এপ্রিল খুলনা-বেনাপোল রুটের বেনাপোল কমিউটার ট্রেনে দৌলতপুর স্টেশন এলাকায় দুর্বৃত্তরা পাথর ছুড়ে মারে। এতে মারাত্মক আহত হন রেলওয়ের পরিদর্শক বায়েজিদ শিকদার। পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে ২০ জেলায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে পাঁচটি ও পশ্চিমাঞ্চলের ১৫টি জেলা রয়েছে। ২০ জেলার মধ্যে ৭০টি স্পটকে স্টোন থ্রোয়িং স্পট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব স্পটে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
প্রসঙ্গত, ১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের জন্য একজন অপরাধীর যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। পাথর নিক্ষেপে রেলযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে ৩০২ ধারায় ফাঁসির বিধান রয়েছে। এছাড়া ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান’ এই অপরাধ করলে অভিভাবকের শাস্তির বিধানও আছে।