মাদক মামলায় সাজা হয়েছে পাঁচ বছরের। জেলও খেটেছেন ২০ মাস। নিম্ন আদালতের দেওয়া ঐ সাজাও বহাল রেখেছে উচ্চ আদালত; কিন্তু এখন আর জেলের ঘানি টানতে চান না। সেজন্য আবেদন করেছিলেন মুক্ত জীবনে থাকার। স্বভাবচরিত্র ভালো এবং অভ্যাসগত অপরাধী না হওয়ায় মাদক মামলায় দণ্ডিত আসামি মতি মাতবরের আবেদন মঞ্জুর করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে—জেলের পরিবর্তে মুক্ত জীবনে থাকাকালে আসামিকে পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখতে হবে। সেবা করতে হবে ৭৫ বছর বয়ষ্ক মায়ের। নিজ ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ও তাদের লালনপালন নিশ্চিত করতে হবে। আইন অনুযায়ী বয়স না হওয়া পর্যন্ত মেয়েদের বিবাহ দিতে পারবেন না। এসব শর্ত ভঙ্গ করলে অবশিষ্ট সাজা ভোগের জন্য তাকে জেলে পাঠানো হবে বলে গতকাল রবিবার রায় দিয়েছেন বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ।
উচ্চ আদালতের এই রায়কে যুগান্তকারী আখ্যা দিয়ে আসামির আইনজীবী মো. শিশির মনির বলেন, বিশেষ আইনের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটিই প্রথম রায়। যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। যদিও আমাদের দেশে এই জুরিসপ্রুডেন্স খুব বেশি এগোয়নি। লুঘু দণ্ডেও একজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। অথচ উন্নত বিশ্বে বড় সাজা হলেও ব্যক্তির আচার-আচরণ, গুণাবলি বিবেচনায় তাকে প্রবেশনে রাখা হয়। যাতে আসামি নিজেকে সংশোধন করতে পারেন।
প্রসঙ্গত, ১ হাজার ১১১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মতি মাতবরসহ দুই জনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২০১৫ সালে ঢাকার কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। ঐ মামলায় ২০১৭ সালে দুই জনকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে মহানগর দায়রা জজ আদালত সাজা বহাল রাখে। এরপর রিভিশন মামলা করেন হাইকোর্টে। রিভিশন আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করে তাকে জামিন দেওয়া হয়। গত অক্টোবর মাসে এই মামলার শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে আসামির আইনজীবীরা বলেন, এ মামলায় প্রবেশন অফেন্ডার্স অ্যাক্টের ৫ ধারা অনুযায়ী আদেশ দেওয়া যেতে পারে। কারণ আসামির এটাই প্রথম অপরাধ। আর কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড নেই। তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো অপরাধ করবেন না। ঐ আইনে প্রবেশনে থাকার সুযোগ পেতে পারেন আসামি।
উক্ত শুনানি গ্রহণ করে হাইকোর্টের নির্দেশে আসামির নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর খুলে দেওয়ার পাশাপাশি তার অতীত ইতিহাস সম্পর্কে প্রতিবেদন দেয় ঢাকা জেলার প্রবেশন অফিসার আজিজুর রহমান মাসুদ। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামির স্বভাবচরিত্র ভালো। অতীতে কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটন করেননি। এরপরই হাইকোর্ট সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দেড় বছরের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অধীনে প্রবেশনে পাঠায়।
আইনজীবীরা বলছেন, আসামি আদালতের দেওয়া শর্ত ভঙ্গ করছে কি না—সেটা সময়ে সময়ে নিম্ন আদালতকে অবহিত করবে প্রবেশন অফিসার। যদি শর্ত ভঙ্গ করে তাহলে বিচারিক আদালত তাকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠাবে। কারণ হাইকোর্ট আসামিকে প্রবেশনে পাঠালেও তার সাজা বহাল রেখেছেন।
উল্লেখ্য, অফেন্ডার্স অ্যাক্টের ৫ ধারার বিধান অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধসহ দণ্ডবিধির অন্য কিছু ব্যতিক্রমধর্মী অপরাধ ব্যতীত অন্য সব অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত তাত্ক্ষণিকভাবে সাজা আরোপ না করে উপযুক্ত ক্ষেত্রে আসামিকে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত এক জন প্রবেশন অফিসারের তত্ত্বাবধানে থাকার নির্দেশ প্রদান করতে পারেন।