কে কাহার চিকিত্সা করিবেন?

শরীর ও মন—এই দুই লইয়াই মানুষ পরিপূর্ণ হয়। মনোবিজ্ঞান বলে, প্রকৃতিগতভাবে মানুষ অবাধ্য প্রজাতির প্রাণী। মানুষ ভিতরে ভিতরে ভীষণভাবে স্বাধীন ও মুক্ত থাকিতে চাহে, যাহা তাহাকে অবাধ্য করিয়া তোলে। কিন্তু সভ্য সমাজের নিয়মকানুন না মানিলে মানুষ আর বন্যপ্রাণীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। যদিও আধুনিক সভ্যতা মানুষকে মানসিকভাবে প্রতিনিয়তই বিবিধ চাপের মধ্যে রাখে। ইহা মোকাবিলার ক্ষমতা সকলের সমান নহে। অনেকের ক্ষেত্রে অত্যধিক মানসিক চাপ, অত্যাচার, নিপীড়ন সহ্য করিতে করিতে কাহারো পিঠ যখন দেওয়ালে ঠেকিয়া যায়, তখনই ঐ ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হইতে শুরু করে। ক্রমশ তাহার মেজাজ খিটখিটা হইয়া যায়, ঘুম কমিয়া যায়; মানুষের প্রতি অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা, ভালোবাসাহীনতা তৈরি হইতে শুরু করে। সত্যিকার অর্থে, এই সমস্যা সভ্য সমাজে বসবাসকারী প্রায় প্রতিটি মানুষেরই কমবেশি রহিয়াছে। যাহারা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়া রহিয়াছেন, মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিলে দেখা যাইবে তাহাদের অনেকেরই মানসিক স্বাস্থ্য বেশ ভীতিজনক পর্যায়ে রহিয়াছে। এই জন্য উন্নত বিশ্বে শীর্ষপদের নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাইতেই হয়। কিন্তু আমাদের দেশে ইহা যেন কল্পনাই করা যায় না। এই দেশে এখনো মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা বলিতে এক কথায় ‘পাগল’ বলিয়া ঠাউরানো হয়। সেই সমস্যা অধিক থাকিলে তাহাদের হাত-পা বাঁধিয়া শিকলবন্দি করা হয়। মানসিক রোগীদের শিকলে বাঁধা জীবন লইয়া হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলিয়াছে, এখনো বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে নারী, পুরুষ, এমনকি শিশু মানসিক রোগীদেরও শিকল পরাইয়া রাখা হয়। মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর কেমনতর চিকিত্সা করা হয়, তাহার ভয়াবহ উদাহরণ দেখা গেল রাজধানীর একটি মানসিক স্বাস্থ্য চিকিত্সাকেন্দ্রে। সোমবার মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমকে ভর্তি করা হইয়াছিল রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড হাসপাতালে। আনিসুল করিমের পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাহাকে কিল-ঘুসি মারিয়া পিটাইয়া হত্যা করিয়াছে। প্রাথমিকভাবে এই অভিযোগের সত্যতাও মিলিয়াছে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে। পরিতাপের সহিত বলিতে হয়, একজন পুলিশ কর্মকর্তার মানসিক চিকিত্সার যদি এই নমুনা হয়, তাহা হইলে আরো শত-সহস্র সাধারণ মানসিক রোগীর চিকিত্সার কী ভয়াবহ দশা হইতে পারে! একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগিতেছেন, এমন প্রতি ২ লক্ষ মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক রহিয়াছেন মাত্র এক জন। এই তথ্যই বলিয়া দেয়, বিপুলসংখ্যক মানসিক রোগীর চিকিত্সা হইতেছে এক অর্থে হাতুড়ে পদ্ধতিতে। মানসিক চিকিত্সার ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিত্সাবিজ্ঞান কোথায় চলিয়া গিয়াছে আর আমরা কোন তিমিরে পড়িয়া রহিয়াছি! কে কাহার চিকিত্সা করিবেন? যাহারা এই ধরনের হাসপাতাল পরিচালনা করিতেছেন, তাহাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক আছে তো? মনে রাখিতে হইবে, প্রতিটি ব্যক্তিই তাহার নিজস্ব মানসিকতার উপর বাঁচেন। মানুষে মানুষে প্রচুর মিল দেখিলেও প্রতিটা মানুষ তাহার নিজস্ব শারীরিক ও মানসিক গঠন লইয়া স্বয়ংসম্পূর্ণ, ইউনিক। সুতরাং মানসিক স্বাস্থ্য লইয়া অবহেলা নহে। বাংলাদেশ আগাইয়া যাইতেছে, তাহা কেবল বস্তুগতভাবে নহে, মানসিক জগতেও আগাইতে হইবে। সুতরাং মানসিক চিকিত্সার বিশ্বমানের আধুনিক ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা আশু কর্তব্য। ইহাও মনে রাখা জরুরি, ভালো থাকা, সুন্দর থাকা, মানসিক সুস্বাস্থ্য লইয়া জীবন যাপন করা একটি চর্চার বিষয়। কাজেই ভালো থাকিবার, আনন্দে থাকিবার চর্চাটাও জরুরি।