রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেছেন, এই ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। আমরা এটিকে হত্যা হিসেবেই দেখছি।
এদিকে ঐ হাসপাতালের ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে মহানগর হাকিম শহিদুল ইসলাম প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আনিসুল করিমের মরদেহ গাজীপুর সিটি করপোরেশন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন আনিসুলের পরিবারের সদস্যরা। অপরদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন।
আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার মাইন্ড এইড হাসপাতালের ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেন :হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কিচেন শেফ মো. মাসুদ, ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান, ওয়ার্ড বয় জোবায়ের হোসেন, তানিফ মোল্লা, সঞ্জীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, লিটন আহাম্মদ ও সাইফুল ইসলাম পলাশ।
বরিশাল মহানগর ট্রাফিক পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আনিসুল করিমের (৩৫) বাড়ি গাজীপুরে। বরিশাল থেকে সোমবারই গাজীপুরের বাসায় গিয়েছিলেন আনিসুল। ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ থাকায় চিকিত্সার জন্য তাকে নেওয়া হয়েছিল আদাবরের ঐ হাসপাতালে। সেখানে নির্যাতনে মারা যান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
যেভাবে পিটিয়ে হত্যা
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পরিবারের সদস্যরা সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আনিসুলকে সেখানে নেওয়ার পর প্রথমে তাকে নাস্তা খেতে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি ওয়াশরুমে যেতে চাইলে হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয় তাকে দোতলায় নিয়ে যান। তার বোন উম্মে সালমা সেখানে যেতে চাইলে তাকে বাধা দিয়ে গেট আটকে দেওয়া হয়। আনুমানিক বেলা ১২টার দিকে আরিফ মাহমুদ জয় নিচে এসে আনিসুল করিমের বোনকে দোতলায় নিয়ে যান। সেখানে আনিসুল করিমকে একটি রুমের ফ্লোরে নিস্তেজ অবস্থায় শোয়া দেখতে পান তার বোন। দ্রুত জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
উপ-কমিশনার হারুন বলেন, হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে কয়েক জন মিলে মারতে মারতে আনিসুল করিমকে হাসপাতালের দোতলার একটি রুমে ঢোকায়। সেখানে তাকে মেঝেতে উপুড় করে শুইয়ে ফেলা হয় এবং তিন-চার জন পিঠের ওপর হাঁটু দিয়ে চেপে বসে। কয়েক জন তার হাত ওড়না দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। কয়েক জন কনুই দিয়ে তার ঘাড়ের পেছনে ও মাথায় আঘাত করে। একজন মাথার ওপরে চেপে বসে এবং সকলে মিলে পিঠ, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিল-ঘুসি মারতে থাকে। এক পর্যায়ে আনিসুল করিম নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় আনিসুলের বাবা ফাইজ্জুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালটির ১৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। তাদের মধ্যে ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। বরিশালের আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ, র্যাব ও পুলিশ সদর দপ্তরেও কাজ করেছেন।
বরিশাল অফিস জানায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে যোগদান করেন আনিসুল করিম। তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতেন, তাই তাকে চিকিত্সার জন্য ঐ হাসপাতালে নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা। ঘটনার সময় আনিসুলের চিকিত্সক বোন এবং চিকিত্সক ভগ্নিপতি সঙ্গেই ছিলেন। তবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনার জাকির আলম মজুমদার জানান, বরিশালে কর্মরত থাকা অবস্থায় আনিসুলের কোনো অস্বাভাবিক আচরণ তারা দেখেননি।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, আনিসুল করিমের মরদেহ গাজীপুর শহরের রাজবাড়ি মাঠে জানাজা শেষে সিটি করপোরেশনের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সকালে নিহতের বাড়ি মহানগরীর জোড়পুকুরপাড় বরুদা এলাকায় গেলে নিহতের বড় ভাই রেজাউল করিম জানান, তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপির কাছে সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি। প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে আনিসুল করিম বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম শারমিন সুলতানা। এ দম্পতির চার বছর বয়সি সাফরান নামে একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন
জাবি সংবাদদাতা জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আনিসুল করিমের মৃত্যুর ঘটনার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন জাবির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুর দেড়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক (ডেইরি গেট) সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমগীর কবির বলেন, তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের মাধ্যমে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে।