তাঁতী সমিতির নামে আমদানি করা সুতায় বাজার সয়লাব

নামেই ‘তাঁতী সমিতি’; কিন্তু সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে চোরাকারবারিরা। তাঁতশিল্প রক্ষায় সরকার তাঁতিদের নামমাত্র শুল্কে সুতা আমদানির অনুমতি দেয়। মূলত বন্ড সুবিধার মাধ্যমে এসব সুতা আমদানি হয়ে থাকে। কিন্তু সরকারের এই সুবিধার অপব্যবহার করছে ঐ চোরাকারবারিরা।

সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে সুতা আমদানিতে ৫০ শতাংশের ওপরে শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু চোরাকারবারিরা মাত্র ৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে সুতা আমদানি করে। এ কারণে স্থানীয় উত্পাদনকারীদের উত্পাদিত সুতা বাজারে চরম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ছে। দেশীয় সুতা থাকছে অবিক্রীত। এ নিয়ে স্থানীয় উত্পাদকেরা সরকারের বিভিন্ন বিভাগে দেনদরবার করেছেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। বরং দিনে দিনে চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য বেড়েইে চলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশে বিভিন্ন জেলায় তাঁতিদের নানা সমিতি আছে। শুধু তাদের নামমাত্র শুল্কে সুতা আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁতী সমিতির আওতাধীন যেসব তাঁতশিল্প রয়েছে, তার বাইরেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নামমাত্র শুল্কে সুতা আমদানি করছে। এক্ষেত্রে তারা সমিতিগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। মিথ্যা ঘোষণায় বিপুল পরিমাণ সুতা আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে তারা।

জানা যায়, তাঁতিরা সুতা আমদানির জন্য সমিতির মাধ্যমে তাঁত বোর্ডের কাছে আবেদন করে। বোর্ডের পক্ষ থেকে আবেদনকারী তাঁত প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা নির্ধারণ করার কথা থাকলেও সেটি অনুসরণ করা হয় না। আমদানি করা সুতার যথাযথ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও ভ্যাট অফিসের দায়িত্ব থাকলেও সেটিও প্রতিপালন করা হয় না। কোনো কোনো তাঁতী সমিতির নামে ১৪ কোটি টাকারও বেশি সুতা আমদানি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলস মালিকদের সংগঠন বিটিএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, তাঁতী সমিতির নামে চলা অসাধু কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তিনি বলেন, প্রায় ছয় মার্কিন ডলার মূল্যের এক কেজি পলিয়েস্টার সুতার আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে এক ডলার। এ ধরনের মিথ্যা ঘোষণা দেওয়ার জন্য স্থানীয় শিল্প যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মোহাম্মদ আলী খোকন দাবি করেন, বিশেষ সুবিধায় আমদানি করা সুতা আমদানিকারকদের বেশির ভাগই ভুয়া। আবার কিছু সমিতিতে প্রকৃত তাঁতি থাকলেও তারা সক্ষমতার বেশি সুতা আমদানি করছেন। এসব আমদানিকারকের ‘বিল অব এন্ট্রি’ পরীক্ষা করলে সত্যতা পাওয়া যাবে।

এদিকে, তাঁতী সমিতির নামে সুতা আমদানি বন্ধে বিটিএমএ বাংলাদেশে তাঁত বোর্ডের কাছে আবেদন করেছে। সংস্থার চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাহ আলমের কাছে লেখা চিঠিতে বিটিএমএ বলেছে, সরকার প্রদত্ত সুবিধা প্রকৃত তাঁতি, অর্থাত্ গরিবেরা কখনোই ভোগ করতে পারেনি। তাঁতী সমিতির বেশির ভাগ সদস্য রজিনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তারা সুতা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে তাঁতী সমিতির সাথে সম্পৃক্ত থাকেন। এছাড়া অনেক তাঁতী সংগঠন সুতা আমদানির সঙ্গে জড়িত; কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই।  বিটিএমএর পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, তাঁতী সমিতিগুলো যেসব সুতা আমদানি করে, সেগুলো তাঁতিরা ব্যবহার করেন না। যেমন তারা ৬০ ও ৮০ কাউন্টের সুতাসহ ভিসকন সুতা আমদানি করে, যেগুলো তাঁতিরা ব্যবহারই করে না।

অবৈধভাবে সুতা আমদানি বন্ধে বিটিএমএ বেশ কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে—প্রকৃত তাঁতি ও তাঁতি সংগঠনের সঠিক তালিকা নির্ধারণ, সংগঠনগুলোর প্রকৃত সুতার চাহিদা ও আমদানি করা সুতা দিয়ে কী ধরনের কাপড় তৈরি হবে তার বিবরণ তৈরি করা। সংশ্লিষ্ট তাঁতের এ ধরনের কাপড় উত্পাদনে সক্ষমতা রয়েছে কিনা তা যাচাই করা। এছাড়া আমদানি করা সুতা দিয়ে কী ধরনের কাপড় তৈরি করা হবে তা আগেই ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে বলে বিটিএমএ অভিমত দিয়েছে। তাঁত সংগঠন বা তাঁতি কর্তৃক আমদানি করা সুতার কার্টন বা ব্যাগের ওপর ‘বিক্রয়ের জন্য নহে’ সিল মেরে দেওয়া  উল্লেখযোগ্য।

এদিকে, তাঁতি সংগঠনের নামে আমদানি করা বিভিন্ন প্রকার সুতা দিয়ে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের টাস্কফোর্স দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব সুতা আটক করে। বিশেষ করে নরসিংদীর মাধবদি, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জে এ ধরনের চোরাই সুতার ব্যাপক বাজার রয়েছে।