সাদিয়া আফরিন কুমু
বাইডেন হোয়াইট হাউজের আসন পাকাপোক্ত করার পর থেকে শুরু হয়েছে চুলচেরা হিসেবনিকেশ, নবনির্বাচিতের আগমনে কার কত লাভক্ষতি; সেই আলোচনাতেই সরব হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গন।
ট্রাম্পের যেসব হটকারী সিদ্ধান্ত আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক শিথিল করেছিল সেগুলোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আমেরিকার প্রতি পুনরায় আস্থাশীল করে তোলার প্রত্যয় মার্কিন মিত্রদের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। বাইডেনের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষীয়মান প্রতাপ ফিরিয়ে এনে একঘরে দশা থেকে মুক্তি দেবে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই দেশটিকে।
ট্রাম্প প্রশাসন জলবায়ু চুক্তিসহ যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল সেগুলোতে আমেরিকাকে ফিরিয়ে নিতে চান বাইডেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ছাড়াও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় ফেরার ঘোষণা তৃতীয় বিশ্বে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ও পরিবেশগত দিক থেকে সংকটাপন্ন দেশগুলোকে বাইডেনের প্রতি আস্থাশীল করে তুলেছে। ট্রাম্প আমলে ন্যাটোর সঙ্গে মার্কিন বৈরিতা নিরসন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে সক্রিয়করণ ও রাজনৈতিক বলয়ে নিকটবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বাইডেনের তত্পরতা পুনরায় ওয়াশিংটনের নেতৃত্বকে জোরদার করবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
নীতিগতভাবে উদারপন্থি বাইডেন কর্তৃক অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্পের রক্ষণশীল নীতি প্রত্যাহার ও মার্কিন ভিসা সহজীকরণের ইঙ্গিত অভিবাসীদের সৌভাগ্য ফিরিয়ে আনবে, তাতে লাভবান হবে অভিবাসী প্রেরণকারী দেশসমূহ ও অভিবাসন প্রত্যাশীরা। ট্রাম্পের সমালোচিত সিদ্ধান্তগুলোর মাঝে কিছু মুসলিম দেশের নাগরিকদের ওপর আমেরিকায় প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা অন্যতম। এ ধরনের ‘নিষ্ঠুর’ ও অযৌক্তিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মুসলিমদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন বাইডেন। মুসলিম সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে মুসলিমদের পাশে থাকার মর্মে এক ভিডিও বার্তাও প্রকাশ করেছেন তিনি। কাশ্মীর, চীনের উইঘুর, মিয়ানমারের রাখাইন ও সিরিয়ার নিপীড়িত মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে বাইডেন জানিয়েছেন, তিনি এই নির্যাতনের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তি বা সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবেন। সব মিলিয়ে মার্কিন এই মোড়লের হাত ধরে আমেরিকার সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পর্কের নতুন সমীকরণের আশায় গোটা মুসলিম বিশ্ব।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আগাগোড়াই সক্রিয় অবস্থান আমেরিকার, তাই পুরো উপমহাদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের দৃষ্টিতেও নিবদ্ধ নব্য নির্বাচিত এই প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক বিশেষ কোনো দল বা ব্যক্তিনির্ভর নয়, তাই প্রেসিডেন্ট বদলালেও এ দুই দেশের সম্পর্কের ব্যত্যয় ঘটবে না বলে আশাবাদী বাংলাদেশের কূটনৈতিকমহল।
কেউ কেউ মনে করেন বাইডেন কট্টর সাম্প্রদায়িক ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন নন। তবে বিশ্লেষকদের দাবি, বাইডেনের রানিংমেট ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিসের হাত ধরে চাঙ্গা হবে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে সুবিধাপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি হবে ভারতের জন্য। নির্বাচনের আগেই পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে ভারতের পক্ষাবলম্বনের ঘোষণা দিয়েছিলেন বাইডেন। এর বাস্তবায়নে ক্রমান্বয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়বে পাকিস্তানের মতো ভারতবিদ্বেষী দেশগুলো। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় উপমহাদেশে বাড়তে পারে ভারতের আগ্রাসি মনোভাব, বাংলাদেশেও বাড়বে ভারত নির্ভরশীলতা। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, বাইডেন আমলে ট্রাম্পের একমুখী কট্টর নীতির অবসানে অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হবে বাংলাদেশ।
মার্কিন মুলুকে ক্ষমতার রদবদলে রং পালটায় রাজনৈতিক চিত্রপটে, বদলায় সম্পর্কের সমীকরণও। বাইডেন আমলে পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতিতে কার কী লাভ-ক্ষতি, তার স্বরূপ উন্মোচনের জন্য থাকতে হবে আরেকটু অপেক্ষায়, চোখ রাখতে হবে আগামী দিনে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ