স্বাধীনতা পরবর্তী অস্থিতিশীল এলোমেলো সময়ে হুমায়ূন আহমেদের উত্থান বাংলা সাহিত্য পরিমণ্ডলে। পরবর্তী সময়ে যাঁর লেখা শীতল বাতাসের মতোই নাড়িয়ে গেছে বইপড়ুয়া অগণিত পাঠকদের। সহজ বাক্য, অনাড়ম্বর বর্ণনা, অভিনব ন্যারেটিভ স্টাইল দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন জীবনের এক আশ্চর্য সহজপাঠ। প্রতিটি কালপর্বে যেকোনো সমাজে একজন স্টোরি টেলার আবির্ভূত হন যিনি তাঁর সময়ের গল্প বলেন নিজস্ব ঢঙে। যে গল্পের সঙ্গে পাঠক একাত্ম হতে পারে। সে গল্প হয়তো মহান নয়, মোহনীয়। কিন্তু এও তো সত্যি, মোহনীয় গল্পের প্রতিই ফোকদের আকর্ষণ বেশি থাকে। ক্রমে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠেন এক আশ্চর্য গল্প কথক। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, গীতিকবিতা, চলচ্চিত্র বিভিন্ন ফরম্যাটে যিনি শুধু গল্পই শোনাতে চেয়েছেন। নাগরিক বুকসেলফ থেকে মফস্বলের আলমিরা কিংবা অভিজাত ড্রয়িং রুমের ঝকঝকে স্ক্রিন থেকে গ্রাম কিংবা মফস্বলের সাদা-কালো ঝিরিঝির স্ক্রিন, সামাজিক শ্রেণি কাঠামোর বিবিধ স্তর ভেদ করে ভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের পাঠকদের কাছে তিনি পৌঁছাতে পেরেছেন। লেখক, নাট্যকার, চলচ্চিত্রনির্মাতা, গীতিকবি, চিত্রশিল্পীসহ বিবিধ বহুমাত্রিক পরিচয়ে এক নয় অনেক জীবন তাঁর। এক দীর্ঘসময় অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাটের মতো একাই শাসন করেছেন নিজস্ব রাজত্ব। প্রাচুর্যে ভরপুর যে রাজত্বকে দূর থেকে সমালোচনা করা গেলেও তাকে উতরানো-অতিক্রম-অস্বীকার করা যায় না।
হুমায়ূন আহমেদের লেখকজীবন ঘটনাবহুল। ১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে তাঁর লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। যদিও তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে লেখা এ উপন্যাসের নামকরণ তিনি করেছিলেন তাঁর বন্ধু, প্রাবন্ধিক রফিক কায়সারের একটি কবিতা থেকে। তাঁর লেখার প্রতি সাহিত্যামোদী মহলে কৌতূহল সৃষ্টির কারণ হিসেবে বাংলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমদ শরীফের স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দেওয়া এবং বই প্রকাশে আহমদ ছফার উদ্যোগের কথা বিবেচনা করা হলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে পর্যাপ্ত অক্সিজেন বুকে নিয়েই তিনি সাহিত্যের হাঙরভরা সমুদ্রে অবগাহন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন—যার প্রমাণ মেলে আরো পরে। ঠিক এই কালপর্বে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। মাসিক ৬৫০ টাকা বেতনে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। ওই সময়ে তিনি ছোটগল্প লেখার প্রতি মনোযোগী হন—যা পরবর্তী সময়ে তাঁর কাজের সবচেয়ে শক্তির জায়গা হয়ে ওঠে। একই বছর তাঁর পাঠক, অনুরাগী ও প্রেমিকা গুলতেকিন খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ওই সময়ের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো উঠে এসেছে তাঁর বিভিন্ন লেখায়। অর্থকষ্ট, দারিদ্র্য আর জীবনের সীমাহীন ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে অদ্ভুত সব চরিত্রের মুখ দিয়ে নিজের জীবনের গল্পই বলে যান তিনি। ফলে, বিষয়বস্তুর দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদের গল্প কিংবা কাহিনি হালকা মনে হতে পারে, কিন্তু এও মিথ্যে নয় যে অহরহ ঘটে যাওয়া দৈন্দনিন ঘটনার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আনন্দ-বেদনার সাতকাহন।
এই সময়ে পলিমার রসায়নে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি অনেকটা ক্যারিয়ারের প্রয়োজনেই। শুধুমাত্র লিখে জীবিকা নির্বাহ করতে যাওয়া বাংলা সাহিত্যের অগ্রজ লেখকদের দৈন্য জীবন সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলেই হয়তো অন্যদের মতো জাগতিক সাফল্য ও অ্যাকাডেমিক জীবনকে উপেক্ষা করেননি তিনি। সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ে নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করে, জীবন ও জীবিকার সমস্ত চাহিদা মিটিয়েই তিনি লিখতে এসেছিলেন বলে অনুভব করা যায়। পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেই তিনি পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোযোগী হয়েছেন। কর্মজীবনে স্থায়িত্ব, পিএইচডি, বিবাহসহ বিভিন্ন কারণে এক দীর্ঘ সময় তাঁকে বই প্রকাশ থেকে দূরে থাকতে দেখা যায়। আশির দশকে হুমায়ূন আহমেদ ফেরেন একজন টেলিভিশন নাট্যকার হিসেবে। তাঁর নাটকগুলোর ছিল তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত নাটক লেখায় ব্যস্ত হন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো নাটক বাংলাদেশের টেলিভিশন-কেন্দ্রিক যৌথ পারিবারিক বিনোদনের এক স্বর্ণালী সময়কেও তুলে ধরে। এই সময়ে তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করে দুটো মাধ্যমে। এক— টেলিভিশন নাটক, দুই—উপন্যাস। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাই আজ অবধি বাংলা টিভি নাটকের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র। অন্যদিকে, হিমু ও মিসির আলী নামের দুটি বিপরীত চরিত্র নির্মাণ করেন তিনি। আধুনিক মানুষ মাত্রই যৌক্তিক, অন্যদিকে মানুষের অনেক কর্মকাণ্ডকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। লজিক ও অ্যান্টিলজিকের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে মানুষ বাস করে। পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবিপরা এলেবেলে বেকার তরুণ হিমু মানুষের শৃঙ্খলিত পৌনঃপুনিক সামাজিক জীবনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে যেন। প্রত্যেকের মাঝেই একজন হিমু বাস করলেও সামাজিক বাস্তবতায় কেউ আর হিমুর জীবন যাপন করতে পারে না। পারিপার্শ্বিক চাপ কিংবা সামাজিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে প্রত্যেক মানুষই নিজের একধরনের ‘সামাজিক ইমেজ’ নির্মাণ করে—যেমন বলেন সমাজবিজ্ঞানী গফনার। বাংলা সাহিত্যের ‘হিমু’ একইসঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং ‘মিসলিডিং’ চরিত্র। ক্ষমতা কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে হিমুর অভিগম্যতা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে সে প্রান্তজনদের কথাই বলে। হেয়ালিপনা ও একধরনের মেগালোমেনিয়াক পার্সোনালিটির মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ফর্মালিটিজের আড়ালে এই সমাজের ভণ্ড রূপকে। অন্যদিকে, মিডিয়া রিপ্রেজেন্টেশনই হিমু চরিত্রের মিসলিডিংয়ের প্রধান কারণ। হিমুকে ঘিরে এই ফ্যান্টাসিপ্রবণতা এবং হিমু চরিত্রের অগভীর পাঠ তারুণ্যের প্রথম পর্বকে বিভ্রান্ত করে দিতে পারে। জীবনযাপনে হিমু হতে গিয়ে জীবনের বিপুল সম্ভাবনাকে অনুভব করতে না পারা তারুণ্যের সংখ্যাও চারপাশে নেহায়েত কম নয়।
লেখালেখি তাঁকে একদিকে যেমন এনে দিয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে সমালোচিতও হয়েছেন তিনি। জনপ্রিয়তা ও অর্থ তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে বহু অগভীর ও চটুল লেখা। কৈশোরে আধাসামরিক চার দেয়ালের সাদাকালো কঠোর জীবনে হুমায়ূন আহমেদ যে কল্পনার রং মেলে দিয়েছিলেন তারুণ্যে সে রঙ ক্রমশ ফিকে হয়ে গেলেও তাঁর লেখা পড়েই সাহিত্যের লাল-নীল দীপাবলির জগতে প্রবেশ করি। জন্মদিনে প্রিয় লেখকের প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।