অস্তিত্বসংকটে পর্যটন খাত

করোনা মহামারির কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের পর্যটন খাতও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আর এই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সময়ও লাগবে বেশি। এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করলেও তা নিছক ঘোষণাতেই আটকে রয়েছে। যেসব ট্যুরিজম ও ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান সরাসরি পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত, তারা এখন পর্যন্ত কোনো প্রণোদনা পায়নি। অথচ দেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রণোদনা প্রাপ্তির বিষয়ে পর্যটন বোর্ড, বেসমারিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে জানিয়েও গত ছয় মাসেও সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে ট্যুর অপারেটর পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানকে স্বল্প সুদে ঋণ এবং তিন বছরের জন্য হলেও কর ছাড় দিতে হবে। কারণ যে ক্ষতি হয়েছে তা এক থেকে দুই বছরেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। কারণ করোনা মহামারির পরে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ খুব একটা ভ্রমণে আগ্রহী হবে না। তাই এই সময়টাতে পর্যটন খাতকে টিকিয়ে রাখতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তারা। তারা বলেন, বুঝতে হবে, বড় একটা জনগোষ্ঠী এ খাতের সঙ্গে জড়িত। পর্যটন খাতে সব প্রতিষ্ঠানের জামানত দিয়ে ঋণ নেওয়ার পরিস্থিতি নেই। সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও পূর্বের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম দেখে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিলে তা পর্যটন খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়ক হবে। কমপক্ষে এক বছর চলার জন্য সহজ শর্তে চলতি মূলধন হিসেবে ঋণ পেলে এই খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

এদিকে করোনা মহামারির কারণে স্থবির হয়ে পড়ে পর্যটনশিল্প। সে পরিস্থিতি এখনো কাটেনি। পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুললেও পর্যটকদের আনাগোনা সেভাবে বাড়েনি। অন্যান্য বছরের তুলনায় ট্যুরিস্টের আনাগোনা এখন অনেক কম। তাই করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তো দূরের কথা, ব্যবসা চালু রাখার খরচও উঠছে না হোটেলগুলোর। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এ খাতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে সংশ্লিষ্ট ৪০ লাখ জনবল বেকার হয়ে পড়েছিল। পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়ায় আবার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে গত আট মাসের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে অনেক ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যারা এখনো টিকে আছে, তারাও রয়েছে অস্তিত্বের সংকটে। পর্যটন খাতের সঙ্গে সুন্দরবনের ভেতরে যে নৌকা চালায়, সে যেমন যুক্ত আবার সমুদ্রসৈকতে যে ছবি তোলে বা গাইড তারাও যুক্ত। এদের বাঁচিয়ে রাখে প্রধানত ট্যুর অপারেটররা। কিন্তু প্রণোদনায় ট্যুর অপারেটররাই উপেক্ষিত।

এ প্রসঙ্গে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর ট্যুরিজমবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য মো. তাসলিম আমিন শোভন ইত্তেফাককে বলেন, পর্যটন খাতে ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। কিন্তু তারাই প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। দ্য বেঙ্গল ট্যুরস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম নাসিম জানান, পর্যটন খাতে প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কেউ তা পাননি।

এদিকে প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধাভোগী হচ্ছে হোটেলগুলো, কিন্তু যে ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, তারা এই সুবিধাবলয়ের বাইরে থাকছে। ফলে পর্যটন ব্যবসার মূল শক্তি যারা, তারাই এই বিপদে প্রণোদনা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি জানান, আগামী বছরের জন্য কোনো বিদেশি ট্যুরিস্ট এখন পর্যন্ত বুকিং দেয়নি। ফলে দেখা যাচ্ছে, করোনার কারণে আগামী দুই বছর কোনো বিদেশি ট্যুরিস্ট আসবে না। সে সময় পর্যন্ত এই ব্যবসা ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। সে কারণেই আমাদের কম সুদে প্রণোদনা প্রয়োজন। কিন্তু তা না পাওয়ায় এখন অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই খাত বিদেশি মুদ্রা অর্জনে ভবিষ্যতে আরো বড়ো ভূমিকা রাখতে পারবে।