সারওয়ার-উল-ইসলাম
বুটুলি কৈশোরে নীল নামে একজনকে মনে মনে ভালোবাসত, তাকে সে কথা বলতে না পারায় এখনো এই মাঝবয়েসে মাঝে মাঝে একাকী রাত না ঘুমিয়েই কাটায়। ছেলেমেয়েরা দেখে মা জেগে আছে। ব্যালকনিতে হাসনাহেনা গাছটার সামনে ইজিচেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে নীলকে নিয়ে কত স্বপ্নের কথা মনে করে বুটুলি।
ছোট থেকে গান পছন্দ বুটুলির। বিটিভির সাদা-কালো যুগের একটা গান এখনো আনমনে গুনগুন করে—‘ওগো সাগর ছোট্ট এই চিঠি নিয়ে ভেসে যা/ঢেউ যেন তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়/তার মনটাকে তেমনি কাঁপায়।’ গানের গীতিকবি যেন বুুটুলির মনের কথাই সেই ছোটবেলায় জেনে গিয়েছিল।
বুটুলি নামটা সেই ভালোবাসার মানুষের দেয়া। ছোটবেলা স্বাস্থ্য ভালো ছিল, বেশ মোটাসোটা। তাই বুটুলি ডাকত। কখনো কখনো আদর করে বুটুলিকে ছোট করে বুটু বলেই ডাকত নীল। এখন অবশ্য একদম স্লিম হয়ে গেছে। তবে তরুণী বয়সের সৌন্দর্য কিছুটা হলেও উঁকিঝুঁকি দিয়ে যায় শরীরে। এখনো লম্বা চুল সমুদ্রের ঢেউকে হার মানায়। হাসলে দুটি চোখও হাসিতে অংশ নেয়।
বিয়ের পর বরের সঙ্গে প্রথমবার হানিমুনে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে কী পাগলামিটাই না করেছিল বুটুলি। ‘ওগো সাগর ছোট্ট এই চিঠি নিয়ে...’ গানটা গাইতে গাইতে একটা পলিথিনের ভেতর ছোট ছোট কিছু ঝিনুক ভরেছিল প্রথমে। তার ভেতরে চিরকুট লিখে কয়েকটা ভাঁজ করে ফেলেছিল। চিরকুটে লিখেছিল, ‘নীল আপনি কোথায়? ইতি আপনার বুটুলি, না না বুটু।’ তারপর সেই পলিথিনটা সাগরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল।
দ্বিতীয়বার কক্সবাজার গিয়ে একইভাবে বুটুলি লিখেছিল, ‘নীল, আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন? ইতি আপনার বুটুলি, না না বুটু।’ তারপর সেই পলিথিনটা সাগরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল।
তৃতীয়বার কক্সবাজার গিয়ে বুটুলি লিখেছিল ‘নীল, আপনি আমাকে নিয়ে যান না। ইতি আপনার বুটুলি, না না বুটু।’ তারপর একই কায়দার সেই পলিথিনটা সাগরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল।
বুটুলির বিশ্বাস ছিল এই পলিথিনটা কোনো একদিন নীলের চোখে পড়বেই। নীল কোথায় আছে জানে না।
বুটুলি কত না খুঁজেছিল বিয়ের আগে নীলকে। এক কাপড়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাবে এই সিদ্ধান্তও নিয়েছিল। যখনই ভেবেছিল নীল তো জানে না বুটুলি তাকে কত ভালোবাসে, চোখের পানিতে দুগাল ভেসে গিয়েছিল তখন।
বুটুলি ডাকটা কতকাল শোনা হয় না!