ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদের চিকিত্সায় ইনসুলিন পাম্প

ডা. বিদৌরা জাবীন

শিশুদের মধ্যে টাইপ-১ ডায়াবেটিস বেশ কমন এন্ডোক্রাইন ও মেটাবোলিক অবস্থা এবং বর্তমানে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আইডিএফ অ্যাটলাসের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ১১ লাখেরও বেশি শিশু এবং ২০ বছরের নিচের কিশোর-কিশোরীর টাইপ-১ ডায়াবেটিস রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বলে দেহে ব্লাড সুগারের পরিমাণ সঠিকভাবে বজায় থাকে না, এ পরিস্থিতিতে, রোগীদের ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পর রোগীকে ইনসুলিনের মাধ্যমে চিকিত্সা দেওয়া হয়। ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ধারাবাহিকভাবে রক্ত পরীক্ষার পাশাপাশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সাধারণত একাধিক ইনসুলিন ইনজেকশন (৬ থেকে ১০ বার পর্যন্ত) গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ সময় উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবন পরিচালনাসহ নিয়মিতভাবে শরীরচর্চা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও, এ বিষয়গুলো মেনে চলা অধিকাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরীর জন্য কষ্টকর। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুদের ডায়াবেটিসের কারণে সৃষ্ট জটিলতাগুলো প্রতিরোধ করতে পারে স্বাভাবিক গ্লুকোজ। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সময় বাসায় বসে কয়েক বার রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষার জন্য একাধিক ডোজ গ্রহণের মাধ্যমে গ্লুকোজ পরীক্ষার বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং।

কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ প্রভৃতি নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব আমাদের প্রতিদিনের পথচলায় পরিবর্তন এনেছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইনসুলিন পাম্পের কথা। ইনসুলিন পাম্প এমন একটি ডিভাইস যা একটি নমনীয় প্লাস্টিকের নলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিত পরিমাণ ইনসুলিন পেশিতে সরবরাহ করে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক শিশুদের প্রতিদিন একাধিকবার ইনজেকশন নেওয়ার বিষয়টি তাদের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে, ইনসুলিন পাম্প তাদের এ ভীতি দূর করতে পারে। কারণ, ইনসুলিন পাম্পে ব্যবহূত ক্যানোলা কয়েক দিন পর পর পরিবর্তন করতে হয়। এটি আমাদের শরীরের মতোই ইনসুলিনের জোগান দেয় এবং সঠিক পরিমাণে একাধিক ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে শিশুদের জীবনযাত্রাকে সহজ করে এবং হাইপোগ্লাইকাইমিয়া (রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কম) এর প্রবণতা হ্রাস করে। নতুন পাম্পটিতে সেন্সর রয়েছে, ফলে সিজিএম (কন্টিনিয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং) সম্পন্ন করা যায়, তাই রক্তে গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণের জন্য দেহে সুই প্রবেশের প্রয়োজন পড়ে না।

ইনসুলিন পাম্পের মাধ্যমে শিশুরা আরো ভালোভাবে গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং যেসব শিশু ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিত্সা নিচ্ছে, তাদের চেয়ে তারা সুস্থ জীবনযাপন করে। এক্ষেত্রে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—এটি রোগীদের চিকিত্সার নিয়মকানুন মেনে চলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও, ইনসুলিন পাম্প দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

গত কয়েক দশকে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ইনসুলিন পাম্পের ইতিবাচক ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী কয়েক বছর ধরে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুরা ইনসুলিন পাম্প ব্যবহার করছে। তবে, বাংলাদেশে এটি ব্যবহারের চর্চা তুলনামূলকভাবে কম। প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ। বারডেমের টি ১ সেন্টারের তথ্য মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বারডেমের টি ১ সেন্টার বাংলাদেশে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করে। গত ২ বছর ধরে এ সেন্টারটি থেকে ইনসুলিন পাম্প দেওয়া হচ্ছে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে যারা ইনসুলিন পাম্প ব্যবহার করছেন, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জটিলতার মুখোমুখি না হয়ে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন।

টাইপ-১ ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা এবং এ রোগটি রোগী, তাদের পরিবার ও সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সিজিএমসহ নতুন প্রযুক্তির ইনসুলিন কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করবে।

n লেখক :কনসালটেন্ট পেডিয়াট্রিক এনডোক্রিনোলজিস্ট, ডিপার্টমেন্ট অব পেডিয়াট্রিকস অ্যান্ড সিডিআইসি পেডিয়াট্রিক ডায়াবেটিস সেন্টার, বারডেম ২, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ