‘সেয়ানে কাঁঠাল খায় বোকার মুখে আঠা’

লোকমান ফারুক

নির্মাণশ্রমিকরা প্রখর রোদ শীতের হিমবাহ সবকিছু উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে ইট, সুরকি বা গাঁথুনির মসলা নিয়ে বহুতল ভবনে ওঠেন। এঁদের কেউ রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, সহকারী আবার কেউ লেবার নামে পরিচিত। সরকারিভাবে নির্মাণ ও কাঠশিল্প সেক্টরের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হলেও সে সম্পর্কে জানা নেই তাঁদের।

দিনশেষে মিস্ত্রি, সহকারী ও লেবারদের ন্যায্য মজুরি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা ও তাঁদের হয়ে কথা বলা যাঁদের দায়িত্ব, সেই ট্রেড ইউনিয়ন-নেতারাই যদি মালিক হন, তখন গল্পটা হয়ে ওঠে ভিন্ন। গাছেরও খায়, তলারটাও কুড়ায়। এমন ঘটনায় ভুক্তভুগী শ্রমিকরা মোটেও বিস্মিত নন। তাঁরা ধরেই নিয়েছেন, এটাই হয়তো নিয়ম। যদি তাই না হবে, তাহলে স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসা এই নেতাদের সম্পর্কে আইন ও প্রশাসন নীরব কেন? আর সব কাজই তারা শ্রম প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শ করে করেন!

এ বছরের শুরুতে, রংপুর বিভাগীয় শহর ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন রেজি: নম্বর রাজ-৮১৮-এর সাধারণ নির্বাচনের দিন স্কুল-মাদরাসার কিশোর ছাত্রদের হাতে ইউনিয়নের ভোটার শনাক্তিপত্র দেখতে পাওয়া যায়। এ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হৈচৈ, বাকবিতণ্ডা, কিছু শনাক্তিপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করি। পরে একজন নির্মাণশ্রমিক-নেতাও স্বীকার করেন, ‘আমাদের কিছু ত্রুটি আছে।’ জানতে পারি, ট্রেড ইউনিয়নটির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ তারিখে। সাধারণ সভায় শ্রম অধিদপ্তর, রংপুর কার্যালয়ের অফিসপ্রধান উপস্থিত ছিলেন। এ সভাতেই নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাম, পদবি উল্লেখ করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। যাঁকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে বাছাই করা হয়, তিনিও সাব-কন্ট্রাক্টর। আর এই ব্যক্তিকে অতীত নির্বাচনেও নির্বাহী কমিটি একই পদে মনোনীত করেন। ৩১ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন ধার্য করে, ৫ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে নির্বাচনি তফশীল ঘোষণা করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অভিযোগ, ‘এই তফশীলে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ বা প্রদর্শনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।’ আর অকস্মাত্ ভোটের তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ জানুয়ারির বদলে ২৪ জানুয়ারি করা হয়।

‘সেয়ানে কাঁঠাল খায়, বোকার মুখে আঠা’। ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নিজেই একজন সাব-কন্ট্রাক্টর। সভাপতিসহ আরো অনেকে তাই। বাংলাদেশ শ্রম আইন ধারা ২-এর ৪৯ (চ) উপধারা মতে, তাঁরা মালিকের সংজ্ঞাভুক্ত। ইউনিয়নটির কর্মপরিধি রংপুর সিটি করপোরেশনের অঞ্চলভিত্তিক। তাঁরা ব্যক্তিস্বার্থে জেলাব্যাপী এর কার্যক্রম বিস্তৃত করেছেন। সাব-কন্ট্রাক্টর দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে বারবার নির্বাচনে জিতে আসা, আর বর্তমান শ্রম অধিদপ্তরের পত্র ছাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়েছেন। ১০ মার্চ ২০২০ তারিখে পুনঃনির্বাচন করার পত্র পাওয়ার পরও আগের কমিটিকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি।

উপরন্তু করোনাকালের এই দুঃসময়ে শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে প্রায় ৪৫০০টি পরিচয়পত্র বিক্রি করা হয়। এই পরিচয়পত্রের মূল্য ধার্য করা হয়েছে—হেডমিস্ত্রিদের জন্য ২০০০ টাকা, মিস্ত্রি-৫০০ টাকা আর সহকারীদের জন্য ২০০ টাকা। একজন সহকারীর শ্লেষাত্মক মন্তব্য ছিল, ‘ভাই কার্ড না করলে সাইডে কাজ করতে দিবে না।’

রংপুর