করোনা মহামারির কারণে আরোপ করা লকডাউন উঠে যাওয়ার পর এখন সবাই যার যার কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। অন্যদিকে লম্বা সময় ধরে ঘরে বন্দি থাকায় সবারই মন টানছে কোথাও বেড়াতে যেতে। অফিস খুলে যাবার পর এখন ছুটি পাওয়া তো কম ঝক্কি নয়! সে কারণেই দূরে বেড়াতে যাওয়ার বদলে কাছে পিঠে দুই এক দিনের জন্য হলেও বেড়াতে যাচ্ছেন অনেকে। আর দূরে যেতে চাইলে কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, সিলেট কিংবা সুন্দরবন তো রয়েছেই। ঘরবন্দি জীবনের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে একটি দিনের এই ঘুরে বেড়ানোই যেন নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে দেহ-মনে। বন্ধুবান্ধব নিয়ে দল বেঁধে একটি দিন ঘুরে বেড়ানো, হইচই করেই সবাই করোনাকালীন বদ্ধ জীবনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইছেন যেন।
আগে বেড়ানো বলতে শুধুই পরিকল্পনা করে দেশের বাইরে কিংবা দেশের ভেতরের পর্যটন কেন্দ্র বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, সিলেট, কক্সবাজারে যাওয়া বোঝাতো। কিন্তু এখন হুট করেই অনেকে চলে যাচ্ছেন বেড়াতে। ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই। করোনা মহামারির ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা যায়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়িয়ে আসা যায় যে কোনো জায়গা থেকে।
করোনাকালের আগে শেষ গত পাঁচ বছরে অভ্যন্তরীণ ট্যুরিজম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। এখন ভ্রমণপিপাসুদের একটা বড় অংশ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এমনকি নিম্নবিত্ত শ্রেণিও দল বেঁধে ঘুরতে বের হচ্ছেন। পর্যটন বিকাশে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই জন্য সব শ্রেণির মানুষের উপযোগী করে অবকাঠামো উন্নয়ন হোটেল সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একটা সময় আমাদের দেশের উচ্চবিত্তরাই শুধু বেড়াতেন। বেড়ানোর মৌসুম মানেই ছিল শীতকাল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে বেড়ানোর সেই ধারা। এখন সারা বছরই বেড়ানোর মৌসুম। দুই দিনের ছুটি পেলেও মানুষ ছুটছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন স্পট।
শুধু দেশের মধ্যে নয়, বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে; বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে। দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাচ্ছেন ভারতে। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মিশরে যাচ্ছেন অনেক মানুষ। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্য মতে, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ৩০ লাখের বেশি মানুষ দেশের বাইরে ঘুরতে যান। দেশের মধ্যে, এমনকি বিদেশে যেতেও ফেসবুকভিত্তিক নানা রকম ট্রাভেল গ্রুপ তৈরি হয়েছে, যেখানে পরিচিত, অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিতরা দল বেঁধে ঘুরতে যাচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে মনোবিদ ও কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল বলেন, মানসিক চাপ আর উদ্বিগ্নতা ঝেড়ে ফেলতে হলে বেড়ানোর বিকল্প নেই। মানুষের কাজের চাপ যত বাড়ছে বেড়ানোর প্রবণতাও সেই হারেই বাড়ছে। মানুষ তার দুশ্চিন্তা কাজের চাপ থেকে মুক্তি পেতেই ঘর ছেড়ে বেড়াতে বের হচ্ছেন। ভ্রমণে যত পথ পাড়ি দেবেন মনের মধ্যে জমে থাকা চাপ, বিষণ্নতা সব কিছুই কমে যেতে থাকবে আর সেইসঙ্গে বাড়তে থাকবে সামাজিক দক্ষতা। যদি কাজের চাপে বা কোনো পরিস্থিতিতে মন হাসফাঁস করতে থাকে তাহলে এই জমে থাকা চাপ আর উদ্বিগ্নতা কমাতে বেড়িয়ে আসুন কোথাও থেকে। বেড়িয়ে আসার পর নিজের মধ্যে নতুন করে উদ্যম খুঁজে পাবেন, মানসিক চাপ কমে যাবে। কাজ থেকে নিজেকে কিছুটা বিশ্রাম দিয়ে সেই সময়টুকু কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করতে পারেন।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এর ট্যুরিজম বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য মো. তাসলিম আমিন শোভন ইত্তেফাককে বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে হঠাত্ করে বেড়েছে বাংলাদেশের মানুষের বেড়ানোর হার। সেটা দেশের ভেতরে ও বাইরে দুই অংশেই। অভ্যন্তরীণ পর্যটন বেড়েছে ব্যাপক হারে। করোনাকাল সেই প্রবণতায় বাধা সৃষ্টি না করলে এটা আরো বৃদ্ধি পেত সন্দেহ নেই।
বেড়াতে যেতে চাইলে প্রথমেই যে কথাটি মনে উঁকি মারে, কোথায় যাওয়া যায়? নীল আকাশের নিচে বসে নীল সাগরের ঢেউ গুনতে চাইলে কক্সবাজার হতে পারে ভালো গন্তব্য। সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় বসে মেঘের ভেলায় ভাসতে চাইলে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি কিংবা সিলেট হতে পারে ভালো বিকল্প। বেড়ানোর জন্য সুন্দরবনও বর্তমানে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। লঞ্চের ডেকে বসে সুন্দরবন দেখতে মন জুড়িয়ে যায়। ঘন জঙ্গলের ভেতরে গা ছমছমে অনুভূতি নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে নৌকা নিয়ে ঘোরাফেরা, হরিণের ছুটে চলা আর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভয় জয় করে শুকনো ট্রেইল ধরে কটকা বিচে ঝাঁপাঝাঁপি তো রয়েছেই।
যদি সময় না থাকে তবে রাজধানীর আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য দর্শণীয় স্থান, ঐতিহ্যের নিদর্শন, বিনোদন পার্কসহ হাজারো পিকনিক স্পট হতে পারে গন্তব্য। পানাম নগরী ঘুরতে গেলে তার সঙ্গে ঘুরে আসা যেতে পারে সোনারগাঁও লোক জাদুঘর। টাঙ্গাইলের চারটি জমিদার বাড়িও অধুনা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ছুট দেয় মাওয়া ফেরি ঘাটে। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু দেখার উত্তেজনার পাশাপাশি ঘাটের ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার রোমাঞ্চও তো কম কিছু নয়!