লঘু দণ্ডের সুযোগে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

শিশু আইনের লঘু শাস্তির সুযোগে কিছু বিপথগামী শিশু আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই বিপথগামিতার সুযোগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠেছে কিশোর গ্যাং। বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক ১৪ শিশুর রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আদালত।

শিশু আদালতের ঐ রায়ে বলা হয়েছে, কোনো শিশুই অপরাধী হয়ে জন্ম নেয় না। সামাজিক পরিস্থিতি, অসত্ সঙ্গ, নৈতিক শিক্ষার অভাব, সর্বোপরি অভিভাবকদের সঠিক পরিচালনার অভাবে সমাজের কিছু কিছু শিশু বিপথগামী হয়। শিশুরা অপরাধী হওয়ার পেছনে তাদের নিজস্ব দায় থাকে না। তারপরও অপরাধের দায়ভার শিশুদের বহন করতে হয়। অথচ এই শিশুদের যথাযথ শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া গেলে এবং তাদের সঠিকভাবে প্রকৃত মানুষ হওয়ার পরিবেশ দিতে পারলে আজকের কোনো শিশুই আর বিপথগামী হতো না।

কয়েক বছর আগে দুইটি কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে উত্তরায় আদনান নামে এক কিশোর নিহত হয়। এরপর থেকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নানা অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। এই গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে এই শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ততার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘গ্যাং কালচার’ অনেকাংশেই ভূমিকা রাখছে। অপরাধের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ততার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যা উঠে এসেছে বরগুনার শিশু আদালতের রায়ে। ঐ রায়ে রিফাতকে খুনের দায়ে শিশু আইনের ৩৪(১) ধারায় রিশান ফরাজীসহ ছয় কিশোরকে ১০ বছরের এবং একই ধারায় আরো চার কিশোরকে পাঁচ বছরের দণ্ড দেয় আদালত। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী আরেক কিশোরকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, রিফাত হত্যা মামলাটি সারা দেশে আলোচিত ন্যক্কারজনক ঘটনা। হতভাগ্য রিফাত শরীফ তারই বন্ধু এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড (নিহত) ও তার সহযোগী রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজীসহ কতিপয় সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হন। এসব আসামির মধ্যে অধিকাংশই শিশু-কিশোর, যারা হত্যাকাণ্ডে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে নির্বিঘ্নে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার জন্য সাহায্য করেছে। চারদিক ঘেরাও করে রেখেছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, রিফাত শরীফকে বরগুনা কলেজ গেটে প্রথম জাপটাইয়ে ধরে শিশু রিশান ফরাজী এবং তার সঙ্গে থাকা রায়হান, নাঈম, রিফাত হাওলাদার, নিয়ামত, অলি, তানভীর, প্রিন্স মোল্লাসহ শিশু অপরাধীরা। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, এই কিশোর অপরাধীরা বিশেষ করে রায়হান, নাইম রিফাত শরীফকে একাধিক আঘাত করেছে। অন্য শিশু অপরাধীরা সঠিক পরিকল্পনামতে ক্যালিক্স একাডেমির সামনে পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এই সময় পর্যন্ত রিফাত ফরাজী, টিকটক হূদয়, রাব্বী আকন সঙ্গে সঙ্গে গিয়েছে। সেখানে নয়ন বন্ড, হূদয় ও রিফাত ফরাজী দা নিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়েছে।

রায়ে বলা হয়েছে, যে শিশুরা জাতির ভবিষ্যত্ এবং আগামীর নির্মাতা তাদের দিয়ে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নির্মমতার ভিত তৈরি হবে সচেতন মহল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ তা প্রত্যাশা করে না। তাই শিশু আইনে লঘু শাস্তি ও অধিকারের সুযোগ নিয়ে কিছু বিপথগামী শিশু যেন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দণ্ডিত এই শিশুরা খুবই ভয়ঙ্কর প্রকৃতির। তাদের ন্যায়বিচারের স্বার্থে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হলো।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, শিশু-কিশোররা অনেক সময় না বুঝেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে যার কারণে তাদের লঘু শাস্তি দেওয়া হয়। যাতে তারা নিজেদের সংশোধন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পায়। কারণ তাদের সামনে পুরো জীবনটাই পুরো থাকে। তিনি বলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আইন প্রণেতারা আইন প্রণয়ন করে থাকেন। যদি তারা মনে করেন ১৭/১৮ বছরের শিশু বেশি করে গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তাহলে পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আইন সংশোধনের সুযোগ তো রয়েছেই।

২০১৩ সালে প্রণীত শিশু আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হবে। এর আগে ১৯৭৪ সালে প্রণীত দি চিলড্রেন অ্যাক্টের ২(এফ) ধারায় শিশুর বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল অনূর্ধ্ব ১৬ বছর পর্যন্ত। ঐ আইন বাতিল করে ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয় শিশু আইন যেখানে শিশুর বয়স নির্ধারণ করা হয় অনূর্ধ্ব ১৮ বছর।

বিদ্যমান শিশু আইনের ৩৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিশু মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে শিশু আদালত তাকে অনূর্ধ্ব ১০ বছর এবং অন্যূন তিন বছর মেয়াদে আটকাদেশ দিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার জন্য আদেশ দিতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, কোনো শিশু মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় নয় এমন কোনো অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে শিশু আদালত তাকে অনধিক তিন বছর মেয়াদে আটকাদেশ দিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার জন্য আদেশ দিতে পারবে।