নওগাঁর বদলগাছীতে দুই গৃহবধূ সাথী বেগম (৩২) ও পরী বেগমকে (২৬) ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যার ৬ মাস পার হলেও ঘটনার কারণ উৎঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে নিহত পরী বেগমের স্বামী নজরুল ইসলাম ও তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হত্যা অভিযোগ তুলেছেন পরী বেগমের আত্মীয়-স্বজনরা।
অপরদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে নিহতদের পরিবাররা ঘুষ গ্রহণ, অসদাচরণসহ নানান অভিযোগ তুলেছেন। দ্রুত এই আলোচিত দুটি হত্যার রহস্য উদঘাটনসহ আসামীদের গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়েছে।
নিহত সাথী বেগম উপজেলার পারআধাইপুর গ্রামের কাঠ মিস্ত্রী আব্দুল কাদিরের স্ত্রী ও পরী বেগম একই উপজেলার কোলা (বিজিপাড়া) গ্রামের স-মিল ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের স্ত্রী।
জানা গেছে, বদলগাছী উপজেলার কোলা বাজারে পাশাপাশি টিনের বাসায় ভাড়া থাকতেন একই উপজেলার পৃথক গৃহবধূ সাথী বেগম ও পরী বেগম।
বাসার মালিক নজরুল ইসলাম নজু ও তার স্ত্রী নার্গিস খাতুন জানান, সেখানে স্থানীয় এক কবিরাজের সাথে পরিচয় হওয়ার পর সাথী বেগমের। এরপর থেকে সাথী বেগমের সাথে পরী বেগম মাঝে মধ্যেই রাতে বাসার বাহিরে থাকতেন। তাদের জিজ্ঞাসা করলেও তারা বলতেন না রাতে কোথায় ছিলেন। ৩ জুন সন্ধ্যায় এমন ভাবেই কাউকে না বলে সাথী বেগমের সাথে পরী বানু গোপনেই গিয়ে হত্যার শিকার হন তারা।
পর দিন ৪ জুন উপজেলার চাংলা গ্রামের একটি গভীর নলক‚পেয়ে স্থানীয়রা দুই নারীর মৃতদেহ দেখাতে পেয়ে থানায় সংবাদ দেন। এরপর পুলিশ নিহতদের মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই জোড়া হত্যার পর চাংলা গ্রামের কবিরাজ আবু হাসান মুকুল, পরী বেগমের স্বামী নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসেন। কবিরাজ মুকুলকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত হত্যার ঘটনা উৎঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
নিহত পরী বেগমের ভাবী একই উপজেলার কয়াভবানীপুর গ্রামের রুপালী বেগম জানান, পরি বেগমের কোন শত্রু ছিল না। পরী বেগমের সাথে বিয়ের পর থেকে স্বামী নজরুল ইসলাম ও তার পরিবারের লোকজন মারপিট ও নির্যাতন করতেন। ফলে গ্রামের বাড়ি বিজিপাড়ায় থাকতে না পেরে কোলা বাজারে ওই বাসা ভাড়া থাকতে হয়েছে পরিকে। স্বামী ও তার ছেলেসহ পরিবারের লোকজন পরীকে পরিকল্পিত অন্য কোথাও হত্যা করে ওই গভীর নলকূপে ফেলে গেছেন।
আরো পড়ুনঃ ২৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ
চাচী জরিনা জানান, পরীকে হত্যার পর থানায় মামলা করতে গেলে স্বামী নজরুল ইসলামের লোকজন বলেছেন, থানায় ৩ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পুলিশ কিনে রাখা হয়েছে। ফলে পুলিশ তাদের কোন মামলাই নিবে না।
চাচা জায়িম উদ্দিন জানান, হত্যার ঘটনায় থানায় স্বামী নজরুল ইসলাম গংদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে আমাদের পরিবারের লোকজনদের সাথে পুলিশ অসদাচরণ করে।
মা আকতারুন বেগম জানান, পরীর পাশের ভাড়াটিয়া সাথীর স্বামী কাদেরের যোগসাজশে পরীর স্বামী নজরুল ইসলাম তার পরিবারের লোকজনকে রাতে নিয়ে যায়। এরপর পরীকে হত্যা করে। হয়তো পরীকে হত্যার ঘটনাটি প্রকাশ পেতে পারে সেই জন্যেই সাথীকেও হত্যা করা হয়েছে।
নিহত পরী বেগমের বাবা নজরুল ইসলাম জানান, তার মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংস ভাবে গলা কেটে হত্যার পর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি। এ সময় থানা থেকে জানানো হয় পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেছে। এরপর ৫ দিন পর আবারো মামলা দায়ের করতে গেলে সঠিক বিচার পাবো বলে পুলিশ একই কথা বলে থানা থেকে তাড়িয়ে দেন। এ পর্যন্ত পুলিশের কোন কর্তা তাদের বাড়িতে আসেননি। অপর প্রশ্নে তিনি আরো জানান, তিনি কিভাবে এজাহারে বাদি হয়েছেন তা জানেন না। তিনি একাধিকবার থানায় মামলা দায়ের করতে গেলেও পুলিশ মামলা গ্রহণ না করেনি। দ্রুত এই হত্যার কারণ উদঘাটন ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
এদিকে পরী বেগমের স্বজনরা পরীকে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে স্বামী নজরুল ইসলাম বলেন, তিনিও তার স্ত্রীকে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করছে বলে তাকে থানা থেকে চলে যেতে বলে পুলিশ। তিনি চলে এসেছেন।
নিহত সাথীর শ্বশুর আমজাদ হোসেন ও তার পরিবারের লোকজন পুলিশের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে বলেন, এই হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে আমাদের পরিবারের লোকজনদের সাথে পুলিশ দুর্ব্যবহার করে।
নিহত সাথী বেগমের স্বামী আবুল কাদের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, পরী বেগমের স্বজনরা যে অভিযোগ করেছেন তা সত্য নয়। তিনিও তার স্ত্রীসহ ওই মহিলা হত্যার দ্রুত আসামীদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
স্থানীয় ও নিহতদের স্বজনরা মনে করছেন, এই আলোচিত জোড়া হত্যার আসামীদের আড়াল করতে প্রভাবশালী চক্রের হাত রয়েছে। ফলে ৬ মাসেও হত্যার কারণ উৎঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
বদলগাছী উপজেলার স্থানীয় কোলা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শাহিনূর ইসলাম স্বপন জানান, আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডের ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ হত্যার কোন রহস্য উৎঘাটন করতে পারেনি। দ্রুত রহস্য উৎঘাটনসহ আসামীদের গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
নওগাঁ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল আকতার জানান, এই জোড়া হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে কবিরাজ আবু হাসান মুকুলসহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়। হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে চাংলা গ্রামের আবু হাসান কবিরাজ মুকুলকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে এলেও হত্যার কোন কারণ উৎঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশ তৎপর রয়েছে হত্যার কারণ বের করাসহ আসামীদের গ্রেফতারের।
ইত্তেফাক/এমএএম