সাইফুল ইসলাম হাফিজ
ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের প্রদেশ টাইগ্রেতে স্থানীয় প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ১১ দিন ধরে চলা সংঘর্ষে ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অঞ্চলটিতে ইতিমধ্যে জরুরি অবস্থা জারি করেছে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকার সংস্থা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং যুদ্ধ অপরাধের আশঙ্কা করছে। টাইগ্রেতে গণহত্যা চলছে বলেও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারের নেতৃত্বাধীন দেশটিতে এমন কী ঘটল যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার শীর্ষে চলে এসেছে ইথিওপিয়া? ইথিওপিয়ার রাজনীতি ও প্রশাসনে মূলত টাইগ্রের লোকজনের প্রভাব দীর্ঘদিনের। সেখানকার নেতারা প্রভাব খাটিয়ে দেশের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছিল, যা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় হুমকি। টাইগ্রের স্থানীয় দলগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় হলো টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ)। ২০১৮ সালে আবি সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করে। প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে অনেক নেতাকে কারাবন্দি করেন। ফলে নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নতুন নির্বাচনের দাবি জানালে আবি প্রশাসন করোনার ছুতো দিয়ে নির্বাচন বিলম্ব করেন। কিন্তু নেতারা কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে নির্বাচন দেয়। জয় লাভ করে টিপিএলএফ। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ নির্বাচনকে ‘সংবিধানের লঙ্ঘন’ আখ্যা দিয়ে সেনা মোতায়েন করেন। ফলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যাই বেশি। এই সংঘাতের কারণে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ সুদান ও ইরিত্রিয়ায় ১৪ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। টাইগ্রের নেতা ডেব্রেটসিয়ন জেরবাই মাইকেলের দাবি কেন্দ্রীয় সরকারকে আলোচনায় বসতে হবে। কিন্তু সরকার তাদেরকে দমনে তত্পর হলে তারা সংঘাত নিরসনে আফ্রিকান ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ানো আবি আহমেদের দেশের মধ্যে সমর্থন ভালো নেই। ক্ষমতায় এসে এক বছরের মাথায় বড় একটি সংঘর্ষ দেখতে হয়েছিল তাকে। ১৯ সালের জুন মাসে সামরিক অভ্যুত্থান রুখতে গিয়ে নিজের বাসভবনে দেহরক্ষীর গুলিতে খুন হয়েছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল সিয়ার মেকোনেন। রাজধানী আদ্দিস আবাবায় তার সঙ্গেই খুন হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর আরো এক জেনারেল জেজাই আবেরাওসহ মোট ছয় জন। আমহারা প্রদেশের গভর্নরকেও সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে প্রাণ দিতে হয়েছিল। রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছিল অনেক মানুষ। শুধু দেশেই না পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক নেই ইথিওপিয়ার। ইরিত্রিয়ার সঙ্গে বিরোধ মীমাংসা করলেও নীল নদে বাঁধ নির্মাণ করে বিরোধের জন্ম দিয়েছে মিশরের সঙ্গে।
বস্তুত, আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম একটি খেলার অঙ্গন হচ্ছে ইথিওপিয়া। পশ্চিমারা চাচ্ছে আবি সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে মিশরকে চাপে রাখতে। আফ্রিকার মধ্যে ইথিওপিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। তাই আমেরিকা, ইসরায়েল আবি আহমেদকে ব্যবহার করে চীনের বিনিয়োগে বাধা দিতে চাচ্ছে। আবার, সহযোগিতার নামে আফ্রিকার দেশগুলোকে চুষে খাওয়া ফ্রান্স চাচ্ছে তার শোষণনীতির বিরুদ্ধে যেন কেউ মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে সে জন্য আবি আহমেদের জনপ্রিয়তাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে চায়। এছাড়া আঞ্চলিক কিছু বিদ্রোহী ও জঙ্গি সংগঠনগুলোর পাঁয়তারায় ইথিওপিয়া ফের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। টাইগ্রের বিবদমান সংঘর্ষ বন্ধ না হলে তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো দেশে। যা আরেকটি গৃহযুদ্ধের সূচনা করবে। আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে ইথিওপিয়ায়। তাই অচিরে এই সংঘাত বন্ধ না হলে ব্যাপক প্রাণহানির সম্ভাবনা রয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সরকার ও টিপিএলএফের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করতে পারে। আবি সরকার টিপিএলএফের সঙ্গে আলোচনায় বসলেই অশান্তির এই আগুন থেমে যায়। কিন্তু তিনি আলোচনার পরিবর্তে টাইগ্রের নেতাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে বিমান হামলা চালিয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সংবাদকর্মীদেরও যেতে বাধা দিচ্ছে; যা গণতন্ত্রের বিপরীতমুখী আচরণ। গণতন্ত্রের আশা দেখিয়ে স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে দেশব্যাপী সংঘর্ষ তার পতনেরও কারণ হতে পারে। শান্তিতে নোবেলজয়ীর দেশে অশান্তির আগুন না জ্বলে শান্তির সুবাতাস বইতে থাকুক—এই প্রত্যাশাই থাকবে আবি আহমেদের কাছে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়