কর প্রদান প্রক্রিয়াকে দ্রুত অনলাইনভিত্তিক করার দাবি
ইত্তেফাক রিপোর্ট
গত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাঠ পর্যায়ের নিচের সারির কর্মকর্তাদের হাতে বেশকিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে কিছু অভিযোগ আসতেও শুরু করেছে। গতকাল ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক কর্মশালায়ও এ ইস্যুটি উঠেছে।
আগে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিস থেকে অনুমোদনের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট স্তরের কর্মকর্তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নথিপত্র জব্দ করা কিংবা পরীক্ষা করতে পারতেন। অর্থ আইনের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ফার্ম স্নেহাশীর্ষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এবারের বাজেটে নিচের সারির কর্মকর্তার (সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বা এআরও) হাতে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এজন্য তার কোনো অনুমতিরও প্রয়োজন হবে না। ঐ এআরও সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট অফিসের অনুমতি ছাড়াই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানা রেইড দেওয়া, নথিপত্র জব্দ করা কিংবা কর ধার্য করতে পারবেন। এতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বাড়ার আশঙ্কার কথা জানান তিনি।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতিমধ্যে কিছু জায়গায় এ ধরনের হয়রানি শুরু হয়েছে। তাদের যথেচ্ছাচার সামাল দিতে এসব কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। ফলে দিন শেষে এতে সরকারের ঘরে খুব বেশি রাজস্ব না এলেও ব্যবসায়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বর্তমান করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতিতে এ বিষয়টি এনবিআরকে গভীরভাবে বিবেচনা করার আহ্বান তাদের।
ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদের সভাপতিত্বে অনলাইনে আয়োজিত গতকালের ঐ কর্মশালায় শতাধিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি অংশ নেন। এতে গত বাজেটে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিষয়ে গত বাজেটে যেসব পরিবর্তন আনা হয়, তা বিশদভাবে তুলে ধরতে দুটি আলাদা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মো. আলমগীর হোসেন ও মাসুদ সাদিক।
করোনা পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার জন্য ভ্যাট প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, করের আওতা বৃদ্ধি, ট্যাক্স ও ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতি সম্পূর্ণ অনলাইন করা, রিফান্ড পদ্ধতি সহজ করা প্রয়োজন। শিল্প খাতের উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে স্থাপিত নিবন্ধিত কারখানাকে লিজ রেন্টের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া, স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করহার কমানোর দাবি জানান।
এ সময় বক্তারা বলেন, বছর বছর করের হার পরিবর্তনের ফলে ব্যবসায়ের প্রাক্কলনে সমস্যা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এছাড়া নতুন করে পণ্যের প্রচার ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণ ব্যয় অনুমোদনে লাগাম টানা, নিত্যপণ্যসহ স্থানীয় ক্রয়ের এলসিতে (ঋণপত্র) ২ শতাংশ হারে উেস কর আরোপ, পেনশন ও গ্র্যাচুইটির ব্যয় অনুমোদন নেওয়া না হলে কর আরোপ, তিন কোটি টাকার ওপরে বিক্রি হলে নতুন করে ০.৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করায় ব্যবসা ও ব্যক্তি করদাতারা ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আলোচনায় উঠে আসে। এছাড়া পণ্য আমদানিকালে অগ্রিম প্রদত্ত কর (করের নামে একধরনের ভ্যাট বা এটি) পরবর্তীতে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। এজন্য নানা ধরনের ডকুমেন্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতায় হয়রানি হচ্ছে বলেও জানান তারা। এসব সমস্যা সমাধানে এনবিআরের সার্বিক কার্যক্রমকে দ্রুত অটোমেশনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থবছর শুরু হওয়ার পর আদেশ জারির মাধ্যমে পরিবর্তন আনায় লাগাম টাকার আশ্বাস দেন এনবিআর সদস্য আলমগীর হোসেন। একই সঙ্গে রপ্তানি খাতসহ এ ধরনের ক্ষেত্রে করের হারে বছর বছর পরিবর্তন না করার বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি গত বাজেটে করদাতা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ডিসিসিআইয়ের ভ্যাট-ট্যাক্স বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক এম শফিকুল আলম, ডিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি এন কে এ মবিন প্রমুখ।