হার মানার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউজ ছাড়ার ইঙ্গিত দিলেন তিনি। শুক্রবার হোয়াইট হাউজে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, জানুয়ারিতে সম্ভাব্য নতুন প্রশাসন আসতে পারে। এদিকে বাইডেনের জয়ের ব্যবধান আরো বেড়েছে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যেও জয় পাচ্ছেন তিনি। সব মিলিয়ে তিনি ৩০৬টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়েছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ৩০৬টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়েছিলেন। তখন তিনি বিপুল জয়ের দাবি করেছিলেন। অন্যদিকে এক প্রশাসন থেকে অন্য প্রশাসনে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিতে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। খবর সিএনএন ও বিবিসির।            পরাজয় মানার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

নির্বাচনে পরাজয় মানতে অস্বীকৃতি জানানোর পর শুক্রবার প্রথমবারের মতো করোনা ভাইরাস টাস্কফোর্সের একটি ব্রিফিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে হাজির হন ট্রাম্প। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ার কারণে তার প্রশাসন কোনো লকডাউনে যাবে না। ভবিষ্যতে যা কিছুই ঘটুক—কে জানে কোন প্রশাসন থাকবে। সেটা সময়ই বলবে। হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি ট্রাম্প।

তবে ট্রাম্প ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে শুক্রবারও একাধিক টুইট করে নির্বাচনের ফলাফলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান যে, শনিবার (যুক্তরাষ্ট্রের সময়) ওয়াশিংটনের একটি সমাবেশে তার সমর্থকদের সঙ্গে তিনি যোগ দিতে পারেন।

জর্জিয়াতেও জয়ী বাইডেন 

নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যেও বিজয়ী হয়েছেন বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিবিসি। ১৯৯২ সালের পর রাজ্যটিতে এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জয় পেলেন। এই বিজয় বাইডেনের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করেছে এবং এ নিয়ে তিনি ইলেকটোরাল কলেজের মোট ৩০৬টি ভোট পেয়েছেন। বাইডেনকে হোয়াইট হাউজে যেতে জর্জিয়া বা অ্যারিজোনায় জিততে হয়নি। উইসকনসিন, মিশিগান এবং পেনসিলভানিয়ায় জয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের বিজয় আগেই নিশ্চিত করেছেন। তবে জর্জিয়াতে ব্যবধান কম হওয়ায় সেখানে সব ভোট হাতে গণনা করা হবে। তবে নতুন গণনায় ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করছে বাইডেন টিম।

ট্রাম্পের আইনি লড়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে

হার না মেনে আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জিততে হলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তিন অঙ্গরাজ্যের ফল উলটে দিতে হবে তাকে যেটা আপাতদৃষ্টিতে অনেক কঠিন। ট্রাম্পের অভিযোগ, ২৮টি রাজ্য তার পক্ষে পড়া লাখ লাখ ভোট সফটওয়্যার মুছে ফেলেছে। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। অবসকিওর টিভি নেটওয়ার্ক ওয়ান আমেরিকা নিউজ (ওএএনএন) থেকে এ অভিযোগ ওঠে এবং পরে টুইটার তাদের এই দাবিকে বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করে।

বাইডেনের জয় নিশ্চিত হওয়ায় শুক্রবার ট্রাম্প টিম অ্যারিজোনার একটি মামলা থেকে সরে এসেছে। পেনসিলভানিয়ায় ট্রাম্পের মামলা পরিচালনাকারী আইনি প্রতিষ্ঠানের দুই আইনজীবী নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সমালোচনার মুখে তারা সরে দাঁড়িয়েছেন। এর ফলে আইনি লড়াইয়ে ট্রাম্প যে সমস্যার মুখে পড়ছেন তার প্রতিফলন ঘটেছে। ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটি পেনসিলভানিয়ায় ট্রাম্পের মামলা বাতিলের জন্য আবেদন করেছে। ঐ রাজ্যে কিছু ডাকযোগের ভোট অবৈধ ঘোষণার জন্য ট্রাম্প টিম যে আবেদন করেছিল সেটি শুক্রবার আদালত খারিজ করে দিয়েছে। মিশিগানের ডেট্রোয়েটের নির্বাচন ফল প্রকাশে স্থগিতাদেশ চেয়ে রিপাবলিকান দলের দুই নির্বাচনি পর্যবেক্ষকের আবেদনও বিচারক খারিজ করে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, আগামী ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে রাজ্যগুলোকে নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হবে এবং ইলেকটরদের বেছে নিতে হবে। তারা ১৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন। আর ২০ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। 

বাইডেনের টিমকে ব্রিফিংয়ের যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ

জো বাইডেনের বিজয়কে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন। তার ট্রানজিশন দলকে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোয় যাওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না এবং নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে তহবিল সরবরাহ করছে না। ফক্স নিউজকে ট্রাম্পের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় মেয়াদেও থাকছে এমন ধারণা নিয়েই তারা কাজ করছেন।

এ অবস্থায় এক প্রশাসন থেকে অন্য প্রশাসনে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে প্রস্তুত হতে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর দেড় শতাধিক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এই ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত হলে সেটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একটি চিঠিতে তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর দায়িত্বে থাকা জেনারেল সার্ভিসেস প্রশাসনকে (জিএসএ) বাইডেন এবং তার রানিং মেট কমলা হ্যারিসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বলেছে, যাতে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা পাশ কাটানো যায়।

কিছুসংখ্যক রিপাবলিকানও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনকে ব্রিফিং করার পক্ষে আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান সহযোগী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন যে, জো বাইডেনের উচিত নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গোপনীয় প্রেসিডেন্ট মেমো নেওয়া শুরু করা। ট্রাম্পের সাবেক চিফ অব স্টাফ জন কেলি ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু না করায় সমালোচনা করেছেন।

বাইডেনের মুখপাত্র জেন পিসাকি বলেছেন, এই ব্রিফিংয়ে যাওয়ার সুযোগ না দেওয়া বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। করোনা ভাইরাস মহামারির প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সময়ের তথ্য প্রয়োজন। আমাদের দল এবং বিশেষজ্ঞদের সেই প্রবেশাধিকার থাকা জরুরি।

সংবাদমাধ্যম চালুর চিন্তা ট্রাম্পের

ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার না করলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আবারও তার প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তার কয়েক জন উপদেষ্টার বরাত দিয়ে রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, এই চার বছরে তিনি যাতে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় থাকেন সেজন্য টিভি চ্যানেল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চালুর ইচ্ছা রয়েছে তার। এছাড়া এই সংবাদমাধ্যম দিয়ে বিরোধী গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে তিনি টক্কর দিতে চান।

এদিকে ট্রাম্পের সমর্থনে গতকাল ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে।

 

ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্প মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গলফ খেলতে যান। এই সময় তাকে সমর্থকরা অভিনন্দন জানান এবং তার আইনি লড়াইয়ের পক্ষে স্লোগান দেন। এছাড়া বামপন্থি কিছু গ্রুপও বিক্ষোভের পরিকল্পনা করছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের আশংকা করা হচ্ছে।