তালেব রানা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয় মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানাচ্ছে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। তারা আশা করছেন, বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের চিরায়ত পররাষ্ট্র নীতির ধারা অনুসরণ করবেন।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বাইডেনকে। প্রতিযোগী চীনকে ঠেকাতে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্চ মোকাবিলা করতে হবে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও ইরান ইস্যুতে কূটনীতি সাজাতে হবে। আবার মিত্র দেশের মধ্যে আস্থা অর্জনে তাকে কাজ করতে হবে। বাকি বিশ্বকে, বিশেষ করে নিকট মিত্রদের বোঝাতে হবে যে, আমেরিকাকে সত্যিই বিশ্বাস করা যায়।
নির্বাচনের কিছু দিন আগেই সিএনএনের এক বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধে বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন ও ইউরোপের সম্পর্কের সাত দশকের যে ভিত্তি ছিল তাতে বড় ফাটল ধরেছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইউরোপের মিত্রদের বিভিন্ন সময় তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের যে খুব একটা আগ্রহ নেই, সেটি প্রকাশ পেয়েছে। আর এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো ব্যাপক পরিসরের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ফিরে পাওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করেছে ইউরোপের দেশগুলো। ব্রাসেলস কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে। যাতে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের একটি সুপার পাওয়ারের ওপর নির্ভশীলতা কমাতে পারে তারা।
বিগত কয়েক বছরে, ট্রাম্প যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে বেশি স্বস্তি পায়নি ইউরোপ। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি, ফাইভ-জির মতো বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ভূমিকায় ইউরোপ এই পুরোনো মিত্রের কাছ থেকে আস্তে আস্তে সরে চীনের দিকে ঝুঁকছে।
অনেক কূটনীতিকের মতে, ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও প্রেক্ষাপটে ইউরোপের এই সরে আসার প্রক্রিয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়েই শুরু হয়। ট্রাম্পের সময়কালে তা দ্রুত এগিয়েছে। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর নজর রাখছেন এমন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চার বছরে এই সম্পর্ক চাপের মুখে পড়েছে। কারণ ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার আগের পৃথিবী আর এখনকার পৃথিবী ভিন্ন। বিশ্বে যখন সত্যিকার অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রয়োজন ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র সবার থেকে বিচ্ছিন্ন।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউরোপের অনেক দেশই জো বাইডেনের জয় আশা করছিল। কারণ সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন মৈত্রীবন্ধনের পক্ষের এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক তিনি আবারও শক্তিশালী করতে পারবেন। ট্রাম্পের অনেক নীতি তিনি বদলে দেবেন।
সম্প্রতি সিএনএনকে এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই মিত্রদের সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে পদক্ষেপ নিতে পারবেন জো বাইডেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো আগামী চার বছর পর আবারও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ তিনি এবারের নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ভোট পেয়েও হেরেছেন। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছেন। তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়লেও চার বছর পর তিনি আবারও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারেন। তখন আবারও মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে বদল দেখা যেতে পারে। যেটা নিয়ে মিত্রদের মধ্যে কিছুটা হলেও শঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাইডেনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছে। তিনি সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির দীর্ঘদিনের সদস্য ছিলেন। দুইবার তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শক্তিশালী মিত্র আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অখণ্ডতার ব্যাপারে তার প্রচেষ্টা সবারই জানা। তারপরও ট্রাম্পের সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মিত্রদের সম্পর্কে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে সেটা সারানো তার জন্য অনেক কঠিন হবে।
সিএনএন বলছে, অনেক শক্ত গণতন্ত্রের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট পররাষ্ট্রনীতির কারণে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ইউরোপের অনেক নেতা বুঝতে পেরেছেন, মার্কিন জনগণ যা-ই বলুক না কেন, প্রেসিডেন্ট নিজের মতো পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে পারেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল কয়েক বারই বলেছেন, নিরাপত্তা ইস্যুতে ইউরোপ আর আমেরিকার ওপর ভরসা করতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক লুইস লুকেনস সিএনএনকে বলেন, বাইডেনকে জরুরিভাবে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করতে হবে। আমেরিকার ওপর আস্থা ফেরাতে কাজ করতে হবে। সেটা একটু কঠিন হবে কারণ অংশীদারদের মধ্যে আশঙ্কা থাকবে যে, চার বছর পর আরেক জন ট্রাম্প আসতে পারেন।
সিএনএনের আরেক নিবন্ধে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ইস্যুতে সক্ষমতা অর্জনে ইউরোপকে নতুন করে পদক্ষেপ নিতে হবে।