শিফারুল শেখ
নির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থীদের বাগিবতণ্ডা, ভোটের দিন কারচুপি, সহিংসতা, ভোটে এক পক্ষের জয় দাবি, অন্য পক্ষের ফল প্রত্যাখ্যান—এ সবই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ভোটাভোটির সময়কার একটা সাধারণ চিত্র। আর যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশে গণতন্ত্রকে মজবুত করা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় নির্বাচনি বিরোধ মীমাংসার আহ্বান জানায়। সাম্প্রতিককালে বেলারুশ, তানজানিয়া এবং অতিসম্প্রতি মিয়ানমারের নির্বাচনের ফল বিরোধীদের না মানার প্রসঙ্গটি চলে আসে। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেন ইলেকটোরাল ভোটে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটি মানছেন না। তিনি নির্বাচনে কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগে আইনি লড়াই করছেন এবং সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন। এই দৃশ্য থেকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পরাশক্তি আমেরিকা এখন কোন পথে যাচ্ছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকার বর্তমান এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সহজ পথ হচ্ছে ট্রাম্পের পরাজয় স্বীকার করা। তবে এই পরিস্থিতি আমেরিকাকে যে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক নানা প্রেক্ষাপটে ভোগাবে সেই আশঙ্কাও আছে।
g বাইডেনের জয়, ট্রাম্পের না
ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এখন ২৯০টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়েছেন, যেখানে সরকার গঠনের জন্য দরকার ২৭০টি। কোনো কোনো মিডিয়ায় বাইডেনকে ৩০৬টি ইলেকটোরাল ভোটও দিয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের এক সপ্তাহের বেশি সময় পর মুখ খুলেছেন এবং নির্বাচনে জালিয়াতি, কারচুপি ও ভোট চুরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও এর আগে টুইটার বার্তায় তিনি নানা অভিযোগ এনেছেন। তিনি এবার কলামিস্ট বাইরন ইয়র্কের সঙ্গে ফোনালাপে কোথায় কোথায় তার জেতার সম্ভাবনা আছে তা জানিয়ে বলেছেন, তিনি বাইডেনের কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে আনতে পারেন। তিনি তার বিরুদ্ধে বাজি ধরতেও মানা করেছেন। যদিও নির্বাচনি কর্মকর্তারা ভোট কারচুপির প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন। ট্রাম্পের দুই ছেলে তার পক্ষে থাকলেও মেয়ে ইভাঙ্কা ও জামাতা জারেদ কুশনার ফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এমনকি অনেক রিপাবলিকানও বাইডেনের জয়কে স্বীকার করছেন। তারা বলছেন, ২০ জানুয়ারি শেষ পর্যন্ত জো বাইডেনই আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন।
g রাজনীতিতে জড়াবে না সুপ্রিম কোর্ট ও সেনাবাহিনী
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। কিন্তু সেটা দলীয় কাজে যেন ব্যবহার না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলে এক অনুষ্ঠানে গত বুধবার বলেছেন, সেনাবাহিনী কোনো ব্যক্তির স্বার্থে ব্যবহার হবে না, সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে কাজ করবে। কারণ আমরা কোনো রাজা, রানি, স্বৈরশাসক, নিপীড়ক এবং ব্যক্তির কাছে শপথ নিইনি, সংবিধানের কাছে শপথ নিয়েছি। তিনি জানান, নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরে সেনাবাহিনী কোনো ভূমিকা পালন করবে না। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আকস্মিকভাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারসহ প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ কয়েক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিলে নানা প্রশ্ন ওঠে। এমনকি প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। আবার বাইডেনও নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ফল না মানলে কী করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের কথা বলেছিলেন।
g ট্রাম্পের পাশে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ ঘনিষ্ঠরা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারসহ হোয়াইট হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এমনকি সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের শীর্ষ ব্যক্তিরাও। বিবিসি এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছে, অনেক রিপাবলিকান বাইডেনের জয়কে স্বীকার করলেও শীর্ষ রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমর্থন দিচ্ছেন। কারণ তারা এক সপ্তাহ বা এক মাসের রাজনীতির হিসেব করছেন না। তারা সারা জীবনের রাজনীতি নিয়ে চিন্তিত। অ্যাটর্নি জেনারেল বার নির্বাচনে কারচুপির তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দ্বিতীয় মেয়াদেও ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণ করবেন বলে আশা করছেন। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারিও ট্রাম্পের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিবিসি বলছে, এসব ব্যক্তিরা জানেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প না থাকলে তারাও চাকরিতে থাকবেন না। এরই মধ্যে জো বাইডেন তার প্রশাসনে কারা আসবেন তাদের তালিকা প্রস্তুত করছেন।
g তৃতীয় বিশ্বের দিকে যুক্তরাষ্ট্র?
বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমাপ্তহীন নির্বাচনের সমাপ্তি কবে হবে? আর ফরচুন ম্যাগাজিন গত পহেলা অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যার শিরোনাম দিয়েছিল ‘আমেরিকার এখন তৃতীয় বিশ্বের দেশ।’ কারণ সারা বিশ্বেই গণতান্ত্রিক ভিত্তি দৃঢ় করা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। সেই দেশটিতে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এই সুযোগে আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোও আমেরিকাকে একহাত দেখাচ্ছে। এই বিষয়ের দিকে নজর দিয়েছেন কেনিয়ার সাংবাদিক প্যাট্রিক গাথারা। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটের আগের দিন গত ২ নভেম্বর আমেরিকায় আফ্রিকান কূটনৈতিকরা এক যৌথ বিবৃতিতে ভোটের দিন মার্কিনিদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। তারা সম্প্রতি নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা, সহিংসতা এবং বিরোধী দলের প্রতি বৈরি আচরণের নিন্দা জানান।
গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আফ্রিকার দেশগুলোতে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনি আচরণবিধি মানা কেবল আফ্রিকার জন্য নয়, সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক ভিত্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে সব পক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে অংশ নেবে এবং এই প্রক্রিয়ায় নিপীড়ন ও হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। ৩ নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক টুইটার বার্তায় বলেন, তানজানিয়ায় এক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অনিয়ম এবং সহিংসতার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাই আমরা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। পম্পেওর টুইটের পালটা জবাবে তানজানিয়ার আইনজীবী নিয়াদল নিউয়োন টুইটার বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে অনিয়ম, রাজনৈতিক হয়রানি এবং সহিংসতার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা চাই এই উদ্বেগের অবসানে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এবং জয়ের আগেই বিজয় দাবি করবে না।