যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে রেখে বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য জোট গঠনের জন্য একটি চুক্তিতে সই করেছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশ। মূলত চীনের প্রচেষ্টায় ‘রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)’ নামের এই জোট হচ্ছে। এই জোটের অন্য সদস্য দেশ হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের ১০ সদস্য দেশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে রবিবার চুক্তিটি সই হয়। এই সম্মেলনের আয়োজক ছিলেন ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী এনগুয়েন জুয়ান। তিনি বলেন, আরসিইপি শিগিগরই স্বাক্ষরকারী দেশগুলোতে অনুসমর্থিত হবে এবং এরপর এটি কার্যকর হবে; এটি কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অবদান রাখবে বলে আশা করেন। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।
বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, এই চুক্তিতে ভারতের যোগ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সস্তা চীনা পণ্য তাদের বাজারে ছেয়ে যাবে এই ভয়ে গত বছর তারা আলোচনা থেকে বেরিয়ে যায়। তবে ভারত চাইলে এই জোটে যুক্ত হতে পারবে। আরসিইপি জোটের অর্থনীতির আয়তন বিশ্বের মোট জিডিপির ৩০ শতাংশ। এই চুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবাধ বাণিজ্য এলাকা তৈরি করবে। এটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মুক্ত এলাকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও বড় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা হবে। ২০১২ সালে প্রথম এই চুক্তির প্রস্তাব করা হয়। গত আট বছর ধরে চীনের প্রবল উত্সাহ এবং উদ্যোগে এটি বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চীনের প্রভাব খর্ব করতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে ১২ দেশের মধ্যে ‘ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ (টিপিপি) চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বাণিজ্যের অধ্যাপক আলেকজান্ডার ক্যাপ্রিকে উদ্ধৃত ব্যাংকক পোস্ট বলেছে, এই জোট চীনকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নে নিশ্চিতভাবে সাহায্য করবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনামলে মুক্ত বাণিজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে পিছিয়েছে, সেই শূন্যতা দখল করছে চীন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নতুন চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে এশিয়ায় বাণিজ্যের নীতি এবং শর্ত নিয়ন্ত্রণ করবে চীন।
অনেক বিশ্লেষক বলছেন, করোনা সংক্রমণের পরিণতিতে আসিয়ান জোটের দেশগুলো যে চরম অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এই চুক্তিতে সই করার ব্যাপারে তাদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চীন বিশ্বের একমাত্র বড় কোনো দেশ, যার অর্থনীতিতে এখনো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনকে নিয়ে ওজর-আপত্তি-উদ্বেগ থাকলেও, তাদের এই বিশাল বাজারের অংশীদার হওয়ার জন্য এশিয়ার বহু দেশ উদগ্রীব।
এই চুক্তির ফলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে জোট এলাকার মধ্যে একে একে অধিকাংশ আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক উঠে যাবে। টেলিযোগাযোগ, মেধাস্বত্ব, ব্যাংক এবং বিমার মতো আর্থিক সেবা, ই-কমার্স এবং পেশাদারি সেবার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও এই চুক্তির আওতায় থাকছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘রুলস অব অরিজিন’ অর্থাত্ কোন দেশ থেকে পণ্য আসছে তার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারিত হবে।
আরসিইপিতে এমন কিছু দেশ রয়েছে যাদের কারো কারো মধ্যে বৈরিতা যেভাবে দিন দিন বাড়ছে তাতে শেষ পর্যন্ত এটি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে এশিয়ান ট্রেড সেন্টারের ডেবোরা এমস্ বিবিসিকে বলেন, কাউকে পছন্দ না করলেও তার সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখা খুবই সম্ভব। আরসিইপি সেটাই করছে। মতভেদ থাকলেও বাণিজ্যের সম্পর্ক থেকে সেগুলোকে আলাদা রাখছে।