জন্মশতবর্ষে জাতির পিতাকে শ্রদ্ধা জাতীয় সংসদের

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করলো জাতীয় সংসদ। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে জাতির পিতার প্রতি বিনশ্র শ্রদ্ধা জানাতে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উত্থাপন করা সাধারণ প্রস্তাব গতকাল রবিবার সংসদে সর্বস্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবটি গ্রহণের আগে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ সংসদ কক্ষে শোনানো হয়।

গত ৯ নভেম্বর সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধির আওতায় শেখ হাসিনা এ প্রস্তাব এনেছিলেন।  নোটিস আকারে তার প্রস্তাব উত্থাপনের পর এনিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা শেষে গতকাল রাত সাড়ে দশটার দিকে প্রস্তাবটি সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ভোটে দিলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।

প্রস্তাবটি পাসের পর স্পিকার বলেন, এর মধ্য দিয়ে বিশেষ অধিবেশন সমাপ্ত হল। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে এই বিশেষ অধিবেশন সংসদীয় কার্যক্রমে যুক্ত করেছে যুগান্তকারী অধ্যায়। সংসদীয় ইতিহাসে এটি এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। এরপর আজ সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্পিকার সংসদের বৈঠক মুলতবি করেন।

জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই বিশেষ অধিবেশন শুরু হয় ৮ নভেম্বর। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ইতিহাসে এটাই প্রথম বিশেষ অধিবেশন। আর সংসদ কক্ষে জাতির পিতার ছবিসহ এটাই সংসদের প্রথম অধিবেশন। গত ৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব উত্থাপনের  আগে সংসদে স্মারক বক্তৃতা দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। গতকাল এই প্রস্তাব গ্রহণের দিনেও সংসদ ভবনে ‘প্রেসিডেন্ট‘স বক্সে বসে সংসদ অধিবেশন দেখেন রাষ্ট্রপতি।

সাধারণ আলোচনার জন্য সংসদ নেতার প্রস্তাব তোলার নজির সংসদীয় ইতিহাসে নিকট অতীতে নেই। সাধারণত জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ বা অন্য কোনো সংসদ সদস্য সাধারণ প্রস্তাব উত্থাপন করে থাকেন। প্রস্তাবটি গ্রহণের আগে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ সরকারি ও বিরোধী দলীয় ৭৯ জন সংসদ সদস্য এর ওপর ১৯ ঘণ্টা ৩ মিনিট আলোচনা করেন। বিষয়টি জানিয়ে স্পিকার শিরীন শারমিন বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, কর্মময় জীবন, দর্শন ও আদর্শের প্রতি গভীর আবেগ, অপার ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপন করা ১৪৭ বিধির সাধারণ প্রস্তাব

“সংসদের অভিমত এই যে ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি, বাঙালির অবিসংবাদিত মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু অন্যায়ের সাথে কখনো আপস করেননি। ১৯৫৭-৪৮ থেকে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৬৬ এর ছয় দফা, ১৯৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন- দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম ও আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার নিরস্ত্র জনগণ ঘরে ঘরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলেছিল। ২৬ মার্চ ১৯৭১ এর প্রথম প্রহরে জাতির পিতা শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ মহান শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান লাভ করে। বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা ও সংবিধান। বঙ্গবন্ধু বিশ্বসভায় বাঙালিকে আত্মপরিচয় নিয়ে গর্বিত জাতিরূপে মাথা উঁচু করে চলার ক্ষেত্র রচনা করেছেন। স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার জন্য মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন তিনি। সেই সময়কালে বাংলাদেশের উন্নয়নের সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন তিনি।

২০২০ সালে জন্মশতবার্ষিকীতে মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক এবং কর্মজীবন ও দর্শনের উপর জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করা হোক।”

নানা অপপ্রচার চালিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রস্তাবটি গ্রহণের আগে এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ার কাজে হাত দিলেন তখন নানা সমালোচনা শুরু হয়। একদলীয় শাসন হয়ে যাচ্ছে, ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে- এমন নানা অপপ্রচার চালানো হয়। অথচ বঙ্গবন্ধু সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। আর্থসামাজিক উন্নয়নই ছিল তার লক্ষ্য। অথচ এনিয়ে সমালোচনা এমনভাবে শুরু করা হলো যে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। পুরো বিষয়টিকে সেসময় উল্টোভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

হঠাত্ বাসে আগুন দেওয়ার উদ্দেশ্য কি?

শেখ হাসিনা বলেন- কোনো কথা নাই, বার্তা নাই, হঠাত্ কয়েকটি বাসে আগুন দিয়ে অগ্নিসন্ত্রাস। কেন? কী স্বার্থে? কীসের জন্য? নির্বাচন হয়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার নামে অংশগ্রহণ করে। টাকা পয়সা যা পায় পকেটে নিয়ে থুয়ে দেয়। ইলেকশনের দিন ইলেকশনও করে না, এজেন্টও দেয় না, কিছুই করে না। মাঝপথে ইলেকশন বয়কটের নাম দিয়ে, এরপর বাসে আগুন দিয়ে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চায়। এটার উদ্দেশ্যটা কী?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার মধ্যে আমাদের বাজেটের প্রায় ৪ শতাংশের উপর আমরা প্রণোদনা, টাকা পয়সা যত যেখানে যা দরকার, আমরা দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা যেন সচল থাকে, সেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা চিকিত্সার ব্যবস্থাও নিচ্ছি। আজকে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে। আমরা এডভান্স টাকা-পয়সা দিয়ে ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন কেনার ব্যবস্থা করে রেখেছি, যাতে যখনই চালু হবে, তখনই যেন আমরা এটা নিতে পারি। যখনই যেটা প্রয়োজন আমরা কিন্তু করে যাচ্ছি। তাহলে অভিযোগটা কোথায়? সেটাই তো সব থেকে বড় প্রশ্ন।

সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা অনেক কাজ করেছি। দারিদ্র্যের হার কমাতে পেরেছি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন আর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে চলে না। নিজেদের অর্থে বাজেট দিতে পারছি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জ আমরা গ্রহণ করেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জাতি গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছি। চিকিত্সা সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছি। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধুকন্যা।

‘প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু’

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু’ নামে গতকাল একটি প্যাভিলিয়ন উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এসময় বড় পর্দায় জাতির পিতার ৭ মার্চের পুরো ভাষণ দেখেন। প্যাভিলিয়নও ঘুরে দেখেন শেখ হাসিনা। সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী এসময় উপস্থিত ছিলেন।