চির অবসরে কিংবদন্তী

সৌমিত্রের বিদায়ে স্মৃতির ডানা মেললেন সকল তারকা

কী এক অনবদ্য জীবন পার করলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়! অভিনয়, চিত্রকলা, বাচিকশিল্প, কথাসাহিত্য সর্বোত্রই নিজেকে বিস্তৃত করে সমৃদ্ধ করেছেন একটা জীবন। তার পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের অভিনেতার কাছে তিনি শিল্পের সবচেয়ে উচ্চতর পাঠ হয়েই বেঁচে থাকবেন। তার এই মহাপ্রয়াণে অগণিত ভক্ত তারকা প্রকাশ করেছেন একজন সৌমিত্রর সঙ্গে তার শখ্য, ভক্তি, কাটানো স্মৃতির গল্প। তারই কিছু গল্প তুলে ধরা হলো শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে—

সৌমিত্র’র সঙ্গে আমার বন্ধুত্বে কোনোকিছুই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি:অপর্ণা সেন

কখনো মনে হয়নি আমি একটা বড় ছবিতে অভিনয় করছি। মনে হয়নি ছবির পরিচালক এক বিরাট মাপের মানুষ। আর আমার পাশে দাঁড়ানো নায়ক মানুষটিও আমার চাইতে ১০ বছরের বড়। অপুর সংসার সিনেমা থেকেই প্রথম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ। বয়সের পার্থক্য থাকলেও সৌমিত্রর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বে কোনোকিছুই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আমাদের যে খুব নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এমন নয়। কিন্তু যখনই কথা হয়েছে, প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গে গড়িয়ে গিয়েছে আড্ডা। কারণ সৌমিত্র ছিলেন সেই বিরল এক মানুষ, যিনি যেকোনো সময়ে যেকোনো বিষয়ে অনর্গল কথা বলে যেতে পারতেন।

তিনি কথা বললে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম:ববিতা

সৌমিত্র দার সঙ্গে আমার কত স্মৃতি, এগুলো কয়েক মিনিটে বলা সম্ভব নয়। আজ ‘অশনি সংকেত’ ছবির শুটিংকালীন অনেক স্মৃতিই মনে পড়ছে। ছবিটির দৃশ্যধারণ হয়েছিল শান্তিনিকেতন ও বীরভূমে। তারা ছিলেন বলেই আমি ‘অনঙ্গ বউ’ হয়ে উঠতে পেরেছিলাম। বেশ ব্যক্তিত্ববান ছিলেন সৌমিত্র। সংস্কৃতির সকল শাখা-প্রশাখা নিয়ে তার জানা-শোনা। তিনি কথা বললে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। দারুণ কবিতা আবৃত্তি করতেন, লিখতেনও। তার মতো নক্ষত্ররা সবসময় আলো ছড়িযে যান। তিনিও যাবেন।

বেঁচে গেলেন তিনি:শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়

আমার ডাকনাম ‘অপু’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অপুর সংসার’ দেখে আমার জ্যাঠতুতো দাদা নামটা দিয়েছিলেন। বাবা সেটা অনায়সে মেনে নেন। সেই থেকে আমি ‘অপু’।

আজ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্য কষ্ট হলেও একটা কথা খুব মনে হচ্ছে—বেঁচে গেলেন তিনি। অনেকদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছিলেন। কিন্তু আমাদের মাথার ওপর থেকে যেন ছাতাটা সরে গেল। শেষের দিকে শৈবাল মিত্রের ছবিতে কাজ করেছিলাম তার সঙ্গে। শেষ দেখা ‘বসু পরিবার’ করতে গিয়ে। বাংলা সংস্কৃতি চর্চার এক যুগের অবসান হলো।

রোজ কাজের পর আমাদের আড্ডা জমতো

নানা বিষয়ে:শর্মিলা ঠাকুর

ভীষণ খারাপ লাগছে। আজ আমার জীবনের এক গভীর শোকের দিন। উনি ছিলেন আমার বহু পুরনো বন্ধু। ওনার মতো কে আছে আর? ওনার অভিনয়, নাট্য পরিচালনা, সাহিত্যে যা অবদান তা যে ঐতিহ্যের পত্তন করেছে, তা চিরন্তন। ওনার আবৃত্তি অসাধারণ। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির শুটিংয়ে উত্তরবঙ্গের এক ডাকবাংলোয় সৌমিত্র, শুভেন্দু ও আমি ছিলাম। রোজ কাজের পর আমাদের আড্ডা জমতো নানা বিষয়ে। উনি এত বিষয়ে গভীরভাবে জানতেন যে, বারবার মুগ্ধ হয়েছি।

উত্তম কুমার বাংলা সিনেমার চে গেভারা আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কাস্ত্রো:পরমব্রত

‘জানো জেঠু, আমার মনে হয়, উত্তম কুমার বাংলা সিনেমার চে গেভারা আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হচ্ছেন ফিদেল কাস্ত্রো।’ জেঠু (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) বললেন, ‘কেন? এমনটা কেন মনে হয় তোর?’ আমি বললাম, ‘দেখো, উত্তম কুমার যখন তার খ্যাতি ও সাফল্যের চূড়ায় তখন মারা গিয়েছিলেন। ফলে তার সেই নায়ক ইমেজটা থেকে গিয়েছে। ঠিক যেমন রাজনীতিতে চে। আর ফিদেল? তাকে কত কিছু দেখতে হয়েছে। ঠিক তোমার মতো।’

ইত্তেফাক/জেডএইচডি